শনিবার, ২৪ জানুয়ারী, ২০০৯

দৈনন্দিন জীবনে নিজের প্রতি মানুষের কর্তব্য

দৈনন্দিন জীবনে নিজের প্রতি মানুষের কর্তব্য


মানুষ নিজের জীবনে যেকোনো পন্থাই অবলম্বন করুক না কেন এবং যেকোনো রাস্তায়ই চলুক না কেন, প্রকৃত সৌভাগ্যের পরিচিতি অর্জন তার নিজেকে চেনার বা আত্মপরিচিতিরই অংশবিশেষ। অর্থাৎ আমরা যদি নিজেদেরকে চিনতে না পারি, তা হলে যেসব প্রকৃত প্রয়োজন পূরণ করার মধ্যে আমাদের সৌভাগ্য নিহিত তা-ও চিনতে পারব না। সুতরাং এটা মানুষের অপরিহার্য কর্তব্য যে, সে যেন নিজেকে চেনে এবং এর মাধ্যমে নিজের প্রয়োজন পূরণ করার চেষ্টা করে। তার একমাত্র সম্পদ নিজের মূল্যবান আয়ুকে সে যেন বিনষ্ট না করে। হজরত রাসূলে কারিম সাঃ ইরশাদ করেছেনঃ ‘যে ব্যক্তি নিজেকে চিনতে পেরেছে, সে তার আল্লাহকে চিনতে পেরেছে।’ আমিরুল মু’মিনীন হজরত আ’লী রাঃ বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজেকে চিনতে পেরেছে, সে মা’রেফাতের সুউচ্চশৃঙ্গে আরোহণ করতে পেরেছে।’
মানুষ নিজেকে চেনার পর লক্ষ করে যে, তার সবচেয়ে বড় কর্তব্য হচ্ছে নিজের মানবতার মূল্যবান সম্পদগুলোর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। এরূপ সুউজ্জ্বল রত্নকে পদদলিত না করা এবং অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক পবিত্রতার দিকে লক্ষ রাখা, যাতে চিরস্থায়ী, সুন্দর ও মনোরম জীবন লাভ করা যায়। আমিরুল মু’মিনীন হজরত আলী রাঃ ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে, তার কাছে কামনা-বাসনা ও লোভ-লালসা খুবই নগণ্য।’
মানুষের অস্তিত্ব দু’টি বস্তুর সমষ্টি। তা হচ্ছে আত্মা ও শরীর। মানুষের কর্তব্য হচ্ছে­ এ দু’টি বস্তুর পবিত্রতা ও দৃঢ়তা সংরক্ষণে সচেষ্ট হওয়া। পবিত্র ইসলামে এ দু’টি বিষয় সম্বন্ধে খুবই সূক্ষ্ম ও পর্যাপ্ত নির্দেশাদি প্রদান করেছে। কাজেই মানুষের উচিত নিজের শরীর ও আত্মার পবিত্রতা রক্ষার্থে সচেষ্ট হওয়া।
ইসলামের পবিত্র জীবনবিধান শারীরিক পবিত্রতা সম্বন্ধে বেশ ক’টি বিধি ও নিয়মাবলি নির্ধারণ করেছে। যেমন রক্ত, শবদেহ, কিছু জীবজন্তুর মাংস এবং বিষাক্ত খাবার গ্রহণ থেকে নিষেধ করেছে। আর নেশা জাতীয় ও নাপাক পানীয় পান করা, পেটপুরে খাওয়া ও শরীরের ক্ষতি সাধন করা হতে বিরত থাকা এবং আরো কিছু নির্দেশ প্রণয়ন করেছে, যার বিস্তারিত বর্ণনা এখানে সম্ভব নয়।
‘পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা’ পবিত্রতা রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ নিয়মাবলির অন্যতম। এজন্য পবিত্র ইসলামের বিধিবিধানে এ বিষয়টির প্রতি খুবই গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, অন্য কোনো আদর্শে সেরূপ গুরুত্ব দেয়া হয়নি। হজরত রাসূলে কারিম সাঃ ইরশাদ করেছেন- পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ।
বলা বাহুল্য, এ হাদিসে যে ভাষায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রশংসা করা হয়েছে, তার চেয়ে অধিক প্রশংসার কোনো ভাষা নেই। গোসল করার ব্যাপারে দীনি দার্শনিকরা বারবার তাগিদ করেছেন। হজরত মূসা ইবনে জাফর ওরফে ইমাম মূসা কাজেম রহঃ বলেছেনঃ একদিন পর একদিন গোসল করলে মানুষ মোটাতাজা ও শক্তিশালী হয়। হজরত আলী রাঃ ইরশাদ করেছেন, ‘গোসলখানা কতই না উত্তম ঘর, যা মানুষের অপরিচ্ছন্নতা দূর করে।’
এ ছাড়া ইসলাম সব ধরনের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার নির্দেশ দিয়েছে। যেমন, হাত-পায়ের নখ কাটা, মাথা ও শরীরের অতিরিক্ত চুল কেটে ফেলা, আহারের আগে ও পরে হাত ধোয়া। চুল আঁচড়ানো, কুলি করা ও নাকে পানি দেয়া, ঘর ঝাড়ু দেয়া, পথঘাট, ঘরবাড়ি ও গাছের ছায়া পরিষ্কার রাখা এবং এ ধরনের আরো অনেক আদেশ।
এসব নির্দেশ ছাড়াও ইসলাম কিছু ইবাদতের নির্দেশ দিয়েছে যেগুলো সম্পাদন করতে হলে স্থায়ী পরিচ্ছন্নতা ও পাকপবিত্রতা অর্জন করতে হয়। যেমন শরীর ও পোশাককে নাপাকি থেকে পবিত্র করা, নামাজের জন্য দিনে কয়েকবার অজু করা এবং নামাজ-রোজার জন্য গোসল করা। যেহেতু অজু ও গোসলের সময় শরীরে পানি ব্যবহার করতে হয় যা পুরো শরীর বা শরীরের সংশ্লিষ্ট অংশে অপরিচ্ছন্নতার আবরণ পড়তে দেয় না। এ থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়, শরীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাকে পরোক্ষভাবে ফরজ করা হয়েছে।
মন ও দেহের পবিত্রতা অর্জনের পর তৃতীয় পর্যায়ে রয়েছে পোশাকের পরিচ্ছন্নতা। হজরত রাসূলে আকরাম সাঃ-এর নবুয়তের প্রথম দিকে যেসব সূরা নাজিল হয়েছে, তার মধ্যে পবিত্র সূরায়ে মুদাচ্ছির অন্যতম। এ সূরার চতুর্থ আয়াতে আল্লাহতায়ালা পোশাক-পরিচ্ছদের পবিত্রতার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেনঃ ‘তোমরা পরিচ্ছদ পবিত্র রাখো।’
নামাজের ক্ষেত্রে পোশাক-পরিচ্ছদের পবিত্রতা ফিকাহ্‌ শাস্ত্রের বিশেষ অর্থে ফরজ। কিন্তু সার্বিকভাবে সর্বাবস্থায় নাপাকি ও ময়লা-আবর্জনা থেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা মুস্তাহাব বা প্রশংসনীয়। প্রত্যেক মনীষীই এ ব্যাপারে বারবার তাগিদ করেছেন। হজরত রাসূলে কারিম সাঃ ইরশাদ করেছেন, ‘যে কেউ পোশাক পরিধান করে, তার তা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা উচিত।’
পোশাক-পরিচ্ছদ ও শরীরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বিধান ছাড়াও একজন মুসলমানের যথাসাধ্য উত্তম বা রুচিসম্মত পোশাক পরিধান করা উচিত এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন চেহারা নিয়ে মানুষের সাথে সাক্ষাৎ করা উচিত। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে­ ‘বলো আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের জন্য যেসব শোভার বস্তু ও পবিত্র জীবিকা সৃষ্টি করেছেন, তাকে কে হারাম করেছে?’ (সূরায়ে আ’রাফঃ আয়াত ৩২)।
দৈনন্দিন জীবনে এসব ইসলামী আচরণ আমরা মেনে চললে আমাদের ব্যক্তিত্ব, পরিবার ও সমাজ মাধুর্য এবং বরকতে ভরে উঠতে বাধ্য। ইসলাম শুধু আমাদের পরকালীন নাজাতের কথাই বলে না; পথনির্দেশ করে দুনিয়ার সমুদয় কল্যাণ আর সুন্দরের।


অধ্যাপক মাওলানা মনিরুল ইসলাম রফিক
ওয়াহাব এসি মসজিদ, হালিশহর, চট্টগ্রাম

কোন মন্তব্য নেই: