শনিবার, ২৪ জানুয়ারী, ২০০৯

ইসলাম ও বিশ্ব-প্রকৃতি


ইসলাম ও বিশ্ব-প্রকৃতি


কোনো মুসলমানই বুকে হাত দিয়ে এ কথা বলতে পারবে না যে, সমসাময়িক বিপর্যস্ত বিশ্বপ্রকৃতির কথা বিশ্ববাসীর সামনে ইসলামী বিশ্বই প্রথম তুলে ধরে। এর পুরো কৃতিত্ব একান্তভাবে ঈলৎদ সফ Club of Rome-এর, যাদের ‘প্রবৃদ্ধির সীমা’ সংক্রান্ত রিপোর্টটি ১৯৭২ সালে পশ্চিমা বিশ্বকে বোম শেলের আঘাত করে। জার্মান বিদেশ মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী স্টাফের একজন সদস্য হিসেবে আমার এখনো মনে পড়ে। কী অপরিসীম গুরুত্বের সাথে তখন আমাদেরকে বৈদেশিক নীতির ওপর এই রিপোর্টের হতাশাব্যঞ্জক প্রতিক্রিয়ার মূল্যায়ন করতে হয়েছিল।
এখনো যে ইসলামী বিশ্ব এ ব্যাপারে বিশেষ সচেতন, তাও নয়। ১৯৯১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণদানকালে জার্মান বিদেশমন্ত্রী Hans-Dietrich Genscher-এর মন্তব্যঃ ‘মানুষ এখনো সৃষ্টির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যাচ্ছে!’ যদিও কথাটি তাদের নিজেদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। অবশ্য বেশির ভাগ ইসলামী রাষ্ট্র যেহেতু অনুন্নত তৃতীয় বিশ্বের সদস্য, তাদের কাছে বিশ্বায়তনে প্রতিবেশ রক্ষার যে ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলো পশ্চিমা বিশ্ব উত্থাপন করে চলছে, তাকে নিতান্তই বিলাসিতা বলে মনে হচ্ছে, যা একমাত্র শিল্পোন্নয়নে অতি উচ্চস্তরে অবস্থিত পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষেই নির্বাহ করা সম্ভব। আবার অন্য দিকে James P. Pinkerton-এর মতো ব্যক্তিত্বের কাছে এই শোরগোলকে নিতান্তই কল্পনাবিলাসী রোমান্টিক প্রকৃতিপ্রেম বলে মনে হচ্ছে।
অবশ্য তার এই মন্তব্যের মাঝে বাস্তবতার ইঙ্গিত আছে। বর্তমানে ইউরোপীয়রা যে প্রচণ্ড উৎসাহের সাথে একেবারে প্রকৃতিবাদী মিশনারির ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন, তার মাঝেও যথেষ্ট অসঙ্গতি লুকিয়ে আছে। বাস্তবিকই, এই অতিসচেতনতা পেছনের (প্রতিবেশগত) দরজা দিয়ে নব্য উপনিবেশবাদের অনুপ্রবেশের চোরাপথ খুলে দিতে পারে।
সামগ্রিকভাবে জার্মানি এবং সে সূত্রে জার্মান মুসলমানরা, যেমন­ Ahmad Von Denffer, Harun Behr এবং অপিল Axel Kohler, প্রকৃতি বিপর্যয়ের লক্ষণগুলো প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথেই একটি বিশ্বমাত্রিক পরিবেশসংক্রান্ত নৈতিকতার নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯৮৯ সালের ১৭ মে ইসলামী সেন্টার কর্তৃক আয়োজিত তাদের ২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানের মূল বিষয়ই ছিল ‘ইসলাম ও পরিবেশ’।
ইসলামের ‘আগে পৃথিবী’ নীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিচে সংক্ষিপ্ত আকারে দেয়া গেলঃ
১. বর্তমানের প্রকৃতি বিধ্বংসী বিপর্যয়ের মূল কারণ হচ্ছে মানুষের আধুনিকতার ঔদ্ধত্য যে তার সৃষ্টিকর্তাকে ভুলে গেছে, যে নিজেকে নির্বাক প্রকৃতির একচ্ছত্র অধীশ্বর জ্ঞান করে ভোগ-লালসার সীমাহীন উল্লাসের প্লাবনে বিশ্ব প্রকৃতিকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চায়, যেন এর অক্ষত থাকার কোনো অধিকারই নেই। পক্ষান্তরে একজন মুসলমান জানে যে, এখানকার কোনো কিছুর ওপরই তার কোনো মালিকানা নেই, মালিকানা একমাত্র আল্লাহ্‌র। বাইবেলের ধারণা মতে সে এখানে আধিপত্য বিস্তারের জন্য বাস করে না বরং এখানে সে অবস্থান করে একজন খায়খালাসি স্বত্বসম্পন্ন মানুষের মতো, প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর দায়িত্বশীল ব্যবহারকারী হিসেবে।
২. সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌ (যিনি এগুলোর প্রকৃত মালিক) মানুষের কাছ থেকে সর্ববিষয়ে মধ্যপন্থী আচরণ পছন্দ করেন এবং কোনো অবস্থাতেই সম্পদের অপচয় পছন্দ করেন নাঃ
‘.... আল্লাহ্‌তায়ালা অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ [সূরা আল আনআম (৬ঃ ১৪১)]
এভাবে তিনি চাকচিক্য, জৌলুশ ও বিলাসিতাকে ত্যাগ করার নির্দেশ দেন, একইভাবে উদর পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পরও খাদ্য গ্রহণ অব্যাহত রাখাটা লালসার অভিব্যক্তি বিধায় তাকে বর্জন করার উপদেশ দেন।
সাধারণভাবে বিচার করলে এই নির্দেশ প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার নির্দেশেই গিয়ে পৌঁছায়। কুরআনের ভাষায়ঃ
‘আল্লাহ্‌র জমিনে বিপর্যস্ত সৃষ্টি কোরো না, যা তিনি এত সুন্দরভাবে বিন্যস্ত করেছেন।’ [সূরা আল আ’রাফ (৭ঃ ৫৬)]
এই প্রেক্ষাপটে একজন মুসলমান হচ্ছে প্রকৃতির জন্মগত প্রতিরক্ষক, যদি সম্যক বিপর্যয়ের কোনো কারণ নাও থাকে।
৩. সমগ্র কুরআনজুড়ে প্রকৃতির যে
বিস্তৃত বর্ণনা দেয়া হয়েছে তার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের মনে আল্লাহ্‌র সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তোলা (এই সাথে এটা আল্লাহর অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণও বটে)। একজন মুসলমানের জন্য মহাবিশ্ব হচ্ছে একটিমাত্র পরিবার যার ঐকতান হচ্ছে আল্লাহতায়ালার প্রেমময় মর্যাদা ও মহিমার স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ।
পবিত্র কুরআন মজিদের সূচিপত্রের দিকে একবার চোখ বুলালেই এই ধারণার সত্যতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যেখানে বেশ কতকগুলো সূরার শিরোনাম দেয়া হয়েছে বিভিন্ন প্রাণী ও প্রাকৃতিক বিষয়াবলির নামানুসারে। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের বুঝে নেয়া দরকার যে বিশ্বপ্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে মানুষকেও একটি বিশেষ ক্ষেত্রে প্রাণিজগতের অন্যান্য সদস্যের সমপর্যায়ে মূল্যায়ন করা হয়েছে। এই সত্যটিকে কুরআন মজিদ সুন্দর কাব্যিক ভাষায় বর্ণনা করেঃ
‘‘পৃথিবীর বুকে বিচরণশীল যেকোনো জন্তু কিংবা নিজ ডানার ওপর ভর করে উড়ে চলা কোনো পাখিই (তোমরা দেখো না কেন) এগুলো সবই তোমাদের মতো (আল্লাহ্‌র বিচিত্র সৃষ্ট) জীব।’ [সূরা আল আনআম (৬ঃ ৩৮)]
এ ব্যাপারে আমাদের ধারণাটি যথেষ্ট পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন যে একজন মুসলমানের জন্য বন্য প্রাণিগুলো, দেওয়ানি আইনের ধারামতো, লা-ওয়ারিশ জীবন্ত বস্তু নয়, বরং এক-একটি উম্মাহ্‌র সদস্য (বিড়াল, কুকুর, ঘোড়াদের উম্মাহ), ঠিক যেভাবে একজন মুসলমান ইসলামী উম্মাহ্‌র একজন সদস্য! এই চেতনার বশবর্তী হয়ে রাসূল সাঃ অত্যাচারিত বা ক্ষুধার্ত প্রাণীদের সপক্ষ হয়ে প্রায়ই মানুষের নিষ্ঠুর আচরণে বাধা প্রদান করতেন। তার মমতাময় প্রযত্ন থেকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পাখিও বাদ যেত না।
অবশ্য এর দ্বারা এমন কথা বলা হচ্ছে না যে মানুষ প্রাণিজগৎ থেকে তার ফায়দা উঠাবে না। তবে এ ক্ষেত্রে তাকে অবশ্যই নির্দিষ্ট সীমার মাঝে আচরণ করতে হবে। ক্রীড়া-কৌতুকের জন্য প্রাণী হত্যাকে ইসলাম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তাদেরকে অযথা উত্ত্যক্ত করাও সমানভাবে নিষিদ্ধ।
৪. কুরআন প্রকৃতি বিজ্ঞানের বিশ্বকোষ নয়, কিন্তু তবুও এর মাঝে প্রকৃতি জগতের আশ্চর্য সব ঘটনাবলির প্রাণবন্ত বিবরণ দেয়া হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে A. Von Denffer সূরা আল ওয়াকিয়াহর ৬৮-৭০ নম্বর আয়াতগুলোর মাঝে অ্ল বৃষ্টির যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় তার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেনঃ
‘কখনো তোমরা সেই পানির (সূত্র) সম্বন্ধে চিন্তা করে দেখেছ কি, যা তোমরা (নিত্য) পান করো। (আকাশের) মেঘমালা থেকে এই পানি কি তোমরা বর্ষণ করো- না আমিই এর বর্ষণকারী? অথচ আমি চাইলে এই (সুপেয়) পানিকে লবণাক্ত করে (পানের অযোগ্য করে) দিতে পারি। আমার সৃষ্টির এসব কলাকৌশল জানা সত্ত্বেও তোমরা কেন আমার কৃতজ্ঞতা আদায় করছ না?’ (৫৬ঃ ৬৮-৭০)
৫. ‘পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অর্ধেক’ নবী করীম সাঃ-এর এই উক্তিটি প্রতিবেশগত বাস্তবতার ওপর প্রয়োগ করলে আমরা দেখতে পাই যে, প্রকৃতির বিরুদ্ধে আজ যে ধ্বংসাত্মক আক্রমণ চলছে তার শুরু হচ্ছে এর অপরিচ্ছন্নকরণের মাঝ দিয়ে।
Holger Schleip-এর ‘প্রকৃতির কোলে প্রত্যাবর্তন’ ধর্মের মাঝে, যা কেতাদুরস্থ ‘গ্রিন’ রোমান্টিকতার আশ্রয়ে আমরা প্রকৃতি দূষণের এই মহা বিপর্যয় থেকে বের হয়ে আসার কোনো পথ খুঁজে পাবো না। প্রকৃতির ওপর দেবত্বারোপ করেও সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করার স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক পরিণতি থেকে আমরা রক্ষা পাবো না।
Ferdinand Fellmann, যিনি নব্য প্রকৃতি দর্শনের অবাস্তব আবেগ প্রবণতা সম্পর্কে আমাদেরকে সাবধান করে দিয়েছিলেন, যথার্থই বলেছেন, ‘প্রকৃতি জগতের মহাবিপর্যয়ের আশঙ্কাকে সামনে রেখে আমাদের সত্যিকার দর্শনতাত্ত্বিক আরব্ধ যা, তা প্রকৃতির নতুন দর্শন নয় বরং প্রযুক্তির নতুন দর্শন। আজকের আমাদের যা প্রয়োজন তা একটি আবেগসর্বস্ব নব্য সর্বখোদাবাদ নয় বরং দানবীয় স্বেচ্ছাচারী প্রযুক্তি বিজ্ঞানের হৃত বিবেককে ফিরিয়ে আনা। মোট কথা, আমাদেরকে আমাদের অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণে বিশ্বপ্রকৃতির প্রতি নতুন আবেদনের আশ্রয় নিতে হবে।
অবশ্য ‘গ্রিন’ আন্দোলনের মধ্যকার অনেক তরুণই ব্যাপারটি বুঝতে শুরু করেছে এবং এটাও বুঝতে শিখেছে যে, তারা যা করছিল তা ‘সবুজপূজা’ (Greenolatry) ছাড়া আর কিছু নয়। তারা লক্ষ করছে যে, অহঙ্কারী নরসর্বস্ব মনোবৃত্তি বিশ্বপ্রকৃতির যে ক্ষতি ইতোমধ্যেই করে ছেড়েছে কেবলমাত্র স্বেচ্ছাপ্রণোদিত আত্মসংযমের প্রতিকার করতে যথেষ্ট নয়। বিশ্বপ্রকৃতিকে বাঁচাতে গেলে সর্বাগ্রে যা করতে হবে তা হচ্ছে ভোক্তা হিসেবে পশ্চিমা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সাধন। কেবল যখন সে নিজেকে মুসলমানের মতো আবদ (আল্লাহর বান্দা) হিসেবে দেখতে শিখবে তখনই তার পক্ষে ভোক্তা হিসেবে নিজের বিবেককে কাজে লাগান সম্ভব হবে এবং কেবল তখনই এমন একটি বিপ্লব ঘটানো সম্ভব হবে।
এ কারণেই মিছে মায়ার পিছে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে অবশেষে অনেক ‘গ্রিন’ সদস্যই ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের অনেকেই তাদের অস্তিত্বগত ঝুঁকির আশঙ্কায় কাতর হয়েছিলেন। মূলত তাদের এই আশঙ্কাটি পশ্চিমাসমাজের মূল্যবোধ সঙ্কটের একটি লক্ষণ মাত্র। পরে এই আশঙ্কাই সৃষ্টিকর্তার কাছে আত্মসমর্পণের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তাগিদে পরিণত হয়, যার বিনিময়ে তারা খুঁজে পায় তাদের চির কাঙ্ক্ষিত শান্তি। এটাই ইসলাম।

মুরাদ হফম্যান

কোন মন্তব্য নেই: