শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০০৯

মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম


মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম


বাংলাদেশে প্রায় ৩ লাখ মসজিদ রয়েছে। প্রতিটি মসজিদে কমপক্ষে একজন করে ইমাম আছেন। যেখানেই জনপদ সেখানেই মসজিদ সেখানেই ইমাম। একজন ইমাম একজন ধর্মীয় নেতা হিসেবে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য এক ব্যক্তিত্ব। বলা যায়, তার অবস্থান সর্বজনীন। একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি তিনি হতে পারেন সমাজপতি, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা অন্য কিছু। কিন্তু অবস্থানগত কারণে তার কথা সবাই শুনতে চান না বা শুনলেও সবাই আস্থা রাখেন না। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলেন ইমাম। তিনি যা বলেন তা আমজনতা শুধু শোনেন-ই না, বরং দৃঢ়চিত্তে বিশ্বাস করেন। ফলে একটি সমাজ তথা একটি দেশের ইতিবাচক পরিবর্তনে একজন ইমামের ভূমিকা অপরিসীম। এই শুভবোধ থেকেই জাতিসঙ্ঘ টঘঋচ-এর মাধ্যমে, মানবসম্পদ উন্নয়নে ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্তকরণ প্রকল্পের মাধ্যমে ইমামদের প্রশিক্ষণ দান করে আসছে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমির মাধ্যমে ইমামদের ৪৫ দিনের লং কোর্স প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে তাদের অংশীদারিত্ব বহুগুণে বাড়িয়ে তুলেছে। উপরোল্লিখিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে রিসোর্সপারসন হিসেবে উপস্থিত থাকেন সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বুদ্ধিজীবী ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ইমাম সাহেব তার ধর্মীয় চিন্তাচেতনার সাথে সমসাময়িক বিশ্বের বাস্তব অবস্থা অনুধাবন করে সমাজে তার প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হন। তিনি ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে নিাক্ত বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব তৈরির প্রয়াস চালান।
১. নিরক্ষরতা দূরীকরণ, ২. কুসংস্কার প্রতিরোধ, ৩. ধর্মীয় গোঁড়ামির উৎসাদন, ৪. ধর্মীয় লেবাসের জঙ্গিবাদ নির্মূল, ৫. যৌতুক প্রথা রোধ, ৬. এইচআইভি অওউঝ প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরি, ৭. জাতীয় যক্ষ্মা নির্মূল অভিযান জোরদারকরণ, ৮. মাদকাসক্তি ও ধূমপান রোধ, ৯. শিশুদের টিকাদান, ১০. বৃক্ষরোপণ, ১১. সন্ত্রাস ও দুর্নীতি প্রতিরোধ, ১২. কিশোর-কিশোরীর প্রজনন স্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণ, ১৩. পরিকল্পিত পরিবার গঠন ও ১৪. স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক মোটিভেশন।
ইমামদের মাধ্যমেই সব সরকার তাদের পলিসি সহজেই জনগণের কাছে পেশ করে। প্রকৃতপক্ষে ইমামদের সামাজিক ও ধর্মীয় প্রভাব সবাই অবগত আছেন, যে কারণে তাদের কোনো কাজের দায়িত্ব দেয়া হলে তারা তা স্বাচ্ছন্দ্যে গ্রহণ করে সুষ্ঠু ও সফলভাবে সম্পন্ন করেন। কিন্তু কী নৈতিকতাবোধ আমাদের, যারা সমাজের জন্য দেশের জন্য এত কিছু করছেন আমরা কি তাদের খোঁজ রাখি? আমরা সরকারের আমলা, বড় রাজনীতিবিদ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কত কিছু; কিন্তু আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন পাড়ার মসজিদে যেই লোকটি আমাদের আদর করে সূরা শিখিয়েছেন, অক্ষর শিখিয়েছেন, আদব-কায়দার হাতেখড়ি দিয়েছেন, আমরা কি তার কথা একবারো চিন্তা করি? সমাজের জন্য অবিশ্রান্ত খেটেখাওয়া এই মানুষের কোনো অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নেই, নেই চাকরির নিশ্চয়তা। নূøনতম খেয়ে-পরে থাকার কোনো ব্যবস্থা কি আমরা তার করতে পেরেছি। সম্পূর্ণ সমাজের দয়ার ওপর নির্ভর এই শ্রেণীর আর্থিক সামাজিক নিরাপত্তার জন্য কোনো উদ্যোগ কি নেয়া হয়েছে। মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০০৬ নামে একটি অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদ কর্তৃক পাস হয়েছে।

কিন্তু নীতিমালা রাষ্ট্রীয় গেজেটেই সীমাবদ্ধ আছে। বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণ পরিকল্পিত হচ্ছে না। সরকারের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যের অন্যতম লক্ষ্য দেশকে ২০১৫ সালের মধ্যে নিরক্ষরমুক্ত করা। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য সরকারের বাস্তবানুগ কর্মতৎপরতা কতটুকু তা জানি না। তবে ১৯৯২ সালে স্বল্প পরিসরে শুরু হওয়া একটি প্রকল্প ‘মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম’ এই লক্ষ্য অর্জনে সরকারকে সহযোগিতা করছে। মসজিদের অবকাঠামোগত সুবিধা গ্রহণ করে স্বল্প ব্যয়ে এ প্রকল্পের মাধ্যমে মসজিদের প্রশিক্ষিত ইমামদের দিয়ে সুবিধাবঞ্চিত অনগ্রসর শ্রেণীকে শিক্ষার মূল ধারায় যুক্ত করা হচ্ছে। প্রকল্পটির যথাযথ সাফল্য লক্ষ্য করে সব গণতান্ত্রিক সরকার প্রকল্পটির কলেবর জ্যামিতিকহারে বৃদ্ধি করেছে। এ প্রকল্পটির মাধ্যমেই দায়িত্বশীলতার সাথে নিরক্ষরমুক্ত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব। ইতঃপূর্বে এ ধরনের সব কার্যক্রমই টেকনিক্যাল ত্রুটিজনিত কারণে ব্যর্থ হওয়ায় ওই কার্যক্রমটি আশার আলো জ্বালিয়েছে।
এ কার্যক্রমের ফলে প্রাক-প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের স্কুলভীতি দূর হচ্ছে, ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির হার আশানুরূপ বাড়ছে এবং ঝরে পড়ার হার কমছে। শিশুশিক্ষার্থীরা প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ভালো পারফরম্যান্স প্রদর্শন করতে পারছে।

এ কার্যক্রমের ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসচেতন করা হচ্ছে। তাদের সঠিক নিয়মে দাঁত মাজা, সেন্ডেল পায়ে টয়লেটে যাওয়া, টয়লেট থেকে এসে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, খাওয়ার আগে হাত ধোয়া, বেশি করে পানি খাওয়া, নিয়মিত খেলাধুলা করা ইত্যাদি ভালো অভ্যাসগুলোর অনুশীলন করানোর ফলে সুস্থ-সবল জাতি গঠনে এ কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আগে উল্লেখ করা দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে দেশের হতদরিদ্র ইমামরা এই ‘মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা’ কেন্দ্র পরিচালনা করে মাসিক ১ হাজার ২০০ টাকা সম্মানী পেয়ে থাকেন। স্বল্প আয়ে সংসারে মাসিক এই নগণ্য অর্থ তাদের জন্য অনেক কিছু। কষ্টে শিষ্টে জোড়াতালি দিয়ে চালানো সংসারে সরকারিভাবে প্রাপ্ত এই সামান্য সম্মানী পেয়ে তারা আরো বেশি দায়িত্ববান হন। প্রাণান্তকর পরিশ্রম করে শিশু শিক্ষার্থীদের পাঠদান করান।
পরিশেষে বর্তমান সরকারের কাছে সবিনয় আহ্বান জানাই, প্লিজ আপনারা দেশের সুবিধাহীন হতদরিদ্র ইমাম আর সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের দিকে তাকিয়ে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্পটি পাস করুন এবং এটি রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করুন।


খালেদ মোঃ শামছুল ইসলাম

আল্লাহর সৃষ্টিরীতির জ্ঞান


আল্লাহর সৃষ্টিরীতির জ্ঞান


ইসলাম যুক্তি ও অনুসৎিসার ধর্ম। এ কারণে পর্যায়ক্রমে সহিষ্ণুতা ও সঠিক পূর্ণতায় তাৎপর্য সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা ইসলামের অন্যতম লক্ষ্য। মানুষ, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে দ্রুতির প্রবণতা অন্তর্নিহিত। অবশ্য এটি আমাদের যুগের বৈশিষ্ট্য। এ জন্য আজ ফসল বুনে কালই তা কাটতে চায়। কিন্তু আল্লাহর সৃষ্টিরীতি অনুযায়ী এ রূপ দ্রুতির কোনো অবকাশ নেই। গাছ থেকে ফল আহরণ করতে হলে এর পর্যায়ক্রম অতিক্রম করতে দিতে হবে। মানুষের সৃষ্টি তো এর প্রকৃষ্ট নজির। কুরআন বলছে­ ‘অতঃপর আমি শুক্রকে পরিণত করি রক্তপিণ্ডে, তারপর রক্তপিণ্ডকে পরিণত করি মাংসপিণ্ডে, তারপর মাংসপিণ্ডকে পরিণত করি অস্থিপঞ্জরে, পরে অস্থিপঞ্জরকে মাংসে আবৃত করে দিই; অবশেষে তাকে গড়ে তুলি অন্য এক সৃষ্টিরূপে। অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত মহান!’ (২৩ঃ১৪)
এমনভাবে মানুষও শিশু থেকে পর্যায়ক্রমে প্রাপ্তবয়স্কে পরিণত হয়। একইভাবে আল্লাহর সুনান অনুযায়ী মানুষের জীবনও বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে। অনুরূপভাবে আল্লাহর দীন বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে অবশেষে পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়েছে। তখন এই আয়াত নাজিল হয়েছে­ ‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম, এই ইসলামকেই তোমাদের দীন মনোনীত করলাম।’ (৫ঃ৩)
বিষয়টি অত্যন্ত সহজ-সরল; কিন্তু চার দিকের অবস্থা দেখে উৎসাহী তরুণরা এতই বিক্ষুব্ধ যে, এই জ্ঞান তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। তারা রাতারাতি ইসলামি রাষ্ট্র কায়েম করে সব সমস্যার সমাধান করে ফেলতে চায়। কিন্তু এটা স্বতঃসিদ্ধ যে, বিপরীত বাস্তবতাকে কেবল ইচ্ছা হাতিয়ার দিয়ে পাল্টানো যাবে না। প্রসঙ্গত একটি অমূল্য বইয়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছিঃ ‘হাত্তা ইয়ুগাইয়িরু মা বিআনফুসিহিম’ (যতক্ষণ না তারা নিজেরা পরিবর্তিত হয়)। এটি লিখেছেন সিরীয় মনীষী জাওদাত সাঈদ (রহঃ)। বইটিতে আত্মা ও সমাজের পরিবর্তন ধারা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আলোচনার ভিত্তি হচ্ছে কুরআনের এই আয়াতঃ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে।’ (১৩ঃ১১) এবং ‘কারণ, আল্লাহ কোনো সম্প্রদায়কে প্রদত্ত সৌভাগ্য পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজেরাই পরিবর্তিত করে দেয় নিজের জন্য নির্ধারিত বিষয়।’ (৮ঃ৫৩)
বইটির ভূমিকার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছেঃ ‘মুসলিম তরুণদের মধ্যে অনেকেরই ইসলামের জন্য জান ও মাল কোরবানির দৃঢ় প্রত্যয় রয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এদের মধ্যে মাত্র মুষ্টিমেয়সংখ্যক তরুণ জ্ঞানের একটি বিশেষ শাখায় অথবা দুর্বোধ্য সত্যকে উন্মোচিত করার লক্ষ্যে অধ্যয়নে উৎকর্ষ অর্জনে আগ্রহ প্রকাশ করে থাকে। উদাহারণস্বরূপ ঈমান ও আমল তথা বর্ণনা ও বাস্তবের শ্রেণী বিভাগ ইত্যাদি সমস্যা রয়েছে। এসব বিষয় এমন সমস্যা সৃষ্টি করে যার বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যপূর্ণ সমাধান না হলে গঠনমূলক সংস্কার অসম্ভব। ইসলামি বিশ্ব এখনো গবেষণা ও লেখনীর মর্ম উদ্ধার করতে পারছে না। কারণ তারা এখনো মনে করে যে, ‘মসির চেয়ে অসি শক্তিশালী।’ এ জন্যই আমাদের শিক্ষা-দীক্ষা স্থবিরতায় পর্যবসিত হয়েছে। ঝাঁপ দেয়ার আগে চিন্তা করার কথা আমরা ভুলেই গেছি। ফলে উপরিউক্ত জ্ঞানের ক্ষেত্রে সর্বাত্মক বিভ্রান্তি বিরাজ করছে। এসবের মধ্যকার পারস্পরিক সমন্বয় ও শৃঙ্খলার বিষয়টি আমরা অধ্যয়ন বা উপলব্ধির চেষ্টা করছি না।
তদুপরি মুসলিম বিশ্বে ঈমানের অবস্থা সম্পর্কেও আমরা এখানে সতর্ক পর্যালোচনা করছি না। এটার অর্থ এই নয় যে, মুসলমানদের ঈমান ও ইসলাম সম্পর্কে মৌলিক জ্ঞান নেই। আমরা বরং মানসিক অবস্থার কথা বলতে চাই যা অবশ্যই মনের গহিন থেকে পরিবর্তন করতে হবে। আর ওই পরিবর্তনই কেবল ঈমানের শর্ত পূরণ করতে পারে অর্থাৎ ঈমান ও আমলের সাযুজ্যের পরিবেশ সৃষ্টিতে সক্ষম।
আত্মত্যাগ ও সাদকার প্রকৃত মর্ম গভীরভাবে উপলব্ধি না করে এখনো বিশ্বাস করা হয়, ওই দু’টো সবচেয়ে মহত্তম পুণ্য। সুপরিকল্পিত ও সুচিন্তিত কৌশলের অনুপস্থিতিতে কেবল কোরবানি করলেই এর লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে না। অবুঝ বিশ্বাস তরুণ মনে জানমাল কোরবানির আবেগ সৃষ্টি করে বটে, এর তাৎপর্য অধ্যয়ন ও উপলব্ধির চেতনা সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়। তাৎক্ষণিক ভাবাবেগ বা চাপ থেকে কোরবানির প্রেরণা আসে; কিন্তু জ্ঞানের অন্বেষার জন্য দরকার অবিশ্রান্ত অধ্যবসায়, চৈতন্য, অন্তদৃêষ্টি ও সমীক্ষার মানসিকতা। আর এটিই পরিশেষে নিশ্চিত সাফল্যের সম্ভাবনা সমুজ্জ্বল করে।
অবশ্য কোনো কোনো তরুণ বিভিন্ন বিভাগে অধ্যয়ন-পঠনের কাজে মনোনিবেশ করলেও শেষাবধি একঘেয়ে ক্লান্তি অনুভব করে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে এবং জ্ঞান-গবেষণা হিমাগারে আশ্রয় নেয়। আমাদের গভীর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই জড়তা ও স্থবিরতার কারণ খুঁজে বের করতে হবে।
আত্মোপলব্ধি ও আত্মসচেতনতা ছাড়াই দ্রুত পরিবর্তন সাধনের প্রবণতা অবান্তর। বিদ্যমান বাস্তবতার প্রতিক্রিয়া উপলব্ধি এক জিনিস, আমাদের নিজস্ব ভূমিকা সম্পর্কে সচেতনতা অন্য জিনিস। এ ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ বিধায় আল কুরআনের এ শিক্ষার ওপরেও আলোকপাত করা হয়েছে। কুরআনে সমস্যার অন্তস্তল হিসেবে খুদী বা অহমকে চিহ্নিত করা হয়েছে, বাইরের অসদাচরণ বা অনাচার নয়। কুরআনুল করীমে সম্পদের যে কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে তার মূল কথা হলো এটাই। এই সহজ-সরল সত্যটি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হলে আমাদের দৃষ্টি আচ্ছন্ন হয়ে যায় এবং তখন নৈরাশ্য, বৈরাগ্য ও স্বৈরাচারী দর্শনের উদ্ভব ঘটে।
অতএব মারাত্মক স্বআরোপিত অবিচার হচ্ছে মানুষ, মহাজগত ও সমাজের অন্তর্নিহিত অনুষঙ্গ অনুধাবনে ব্যর্থতা। ফলে কোনো অবস্থানে নিজেকে স্থাপিত করলে মানুষ আল্লাহর সুনান (রীতি) অনুযায়ী মানবীয় ও প্রাকৃতিক সম্ভাবনাকে সর্বোত্তম উপায়ে আহরণ করতে সক্ষম, তার বিচার করতে ভুল করে সে ব্যর্থতার গ্লানি বহন করে। এই দৃষ্টিতে সমস্যার সম্মুখীন হলে দু’টি মানসিকতার উদ্ভব হয়। প্রথমত, এটা বিশ্বাস করা যে, সমস্যাটি নির্দিষ্ট ধারায় নিয়ন্ত্রিত, অতএব একে সমাধান ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। দ্বিতীয়ত, এই বিশ্বাস দ্বারা চালিত হওয়া যে, এটি রহস্যময় ও অতিপ্রাকৃতিক, অতএব কোনো রীতি দ্বারা এটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য নয়। এই দুই চরম মানসিকতার মধ্যে বহুবিদ মধ্যবর্তী দৃষ্টিভঙ্গিও রয়েছে যা মানুষের অনুসৃত পন্থা, আচার-আচরণ ও ফলাফল থেকে আঁচ করা যায়।
ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী মুসলমানদের জীবন নির্বাহে ব্যর্থতা একটি সমস্যা যা সহজেই অনুমেয়। এটি মেনে নিলেও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে উপরিউক্ত দৃষ্টিভঙ্গির কোনটি মুসলমানদের পোষণ করা উচিত? বস্তত এরূপ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই সচেতনতা সৃষ্টি করলেই মুসলমানরা সমস্যার সমাধানে কোন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করবে এবং কোনটি পরিহার করবে তা নির্ণয়ে সহায়ক হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, দুই দৃষ্টিভঙ্গি গুলিয়ে গিয়ে প্রতিটিই অবান্তর হয়ে গেছে। সুতরাং এর সমাধান বহুলাংশে নির্ভর করে পরিচ্ছন্ন অন্তদৃêষ্টির ওপর।’
লেখকঃ মিসরীয় বিখ্যাত পণ্ডিত। তিনি মিসর সরকারের আওকাফ মন্ত্রণালয়ের বোর্ড অব রিলিজিয়াস অ্যাফেয়ার্সের একজন সদস্য ছিলেন। বর্তমানে তিনি ওআইসি’র ফিকাহ একাডেমিসহ বহু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সদস্য।


ড. ইউসুফ আল কারজাভি

ইসলামে আমানতদারি


ইসলামে আমানতদারি


গচ্ছিত জিনিসের সংরক্ষণ ও হেফাজত করার নাম আমানতদারি। হেফাজতের দায়িত্ব যার ওপর ন্যস্ত করা হয় তাকে ‘আমিন’ অর্থাৎ আমানতদার বলা হয়। সমাজে প্রচলিত অর্থে আমিন বলা হয় ওই ব্যক্তিকে বা জমিজমার খোঁজখবর রাখেন ও জরিপ করেন। বিশিষ্ট তাফসিরবিদ আল্লামা কুরতুবি রহঃ-এর দৃষ্টিতে আমানতদারির বিষয়টি অত্যন্ত ব্যাপক। ইসলামী জীবনপদ্ধতির সব কিছুর সাথে আমানতদারির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। অর্থাৎ ফরজ, ওয়াজিব, ইবাদত, মুয়ামালাত (দৈনিক আচার ব্যবহার) সব কিছুই আমানতের অন্তর্ভুক্ত। আর এ সব আমানত আল্লাহপ্রদত্ত।
আল্লাহর অবতীর্ণ কুরআন মাজিদ (জীবনপদ্ধতির শ্রেষ্ঠগ্রন্থ) একটি আমানত। তাই কুরআনে এ মহাগ্রন্থকে আমানত নামে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহর দেয়া খেলাফত একটি আমানত। যাকে খেলাফতের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তিনিও আমিন। সালাত, সাওম, জাকাত, হজের মতো মুয়ামালাতের সাথে সংশ্লিষ্ট সব বিষয় পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান সন্ততি, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, বু-বাব এমনকি প্রতিটি মানুষের হাত-পা, চোখ-কান, নাক, মাথা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি সবই আমানতের আওতাভুক্ত। হাক্কুল্লাহ ও হাক্কুল ইবাদ সবটাই আমানত।
রাষ্ট্র পরিচালনা, সরকারি ও বেসরকারি দাফতরিক কাজকর্ম, শিক্ষকতা, সমাজের নেতৃত্ব, ব্যবসা-বাণিজ্য, মজুরি, শ্রম-মেহনত, দেশপ্রেম ইত্যাদি সবই আমানত। সুতরাং আমানত শব্দটি ব্যাপকার্থে ব্যবহৃত হয়। অনেকে অর্থ সম্পদের মধ্যে আমানতটি সীমিত রাখে, যা সম্পূর্ণ ভুল। বরং মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের সাথে আমানত অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই প্রতিটি ব্যক্তি একজন আমানতদার। আমানতদার ব্যক্তি সমাজের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রশংসনীয়, সুনামি ও সুখ্যাত। আমানতদারি এমন এক মহৎ গুণ, যার ওপর জাতির উন্নতি ও সমৃদ্ধি নির্ভরশীল।
এরই বিপরীত হলো খেয়ানত। কোনো দেশ যা জাতীয় অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, নৈরাজ্য, দেউলিয়াপনা, অকার্যকরতা সৃষ্টি হয় আমানতকারীর অভাবে এবং খেয়ানতের কারণে। মানুষ যখন আমানতদারিকে বিসর্জন দিতে থাকে এবং খেয়ানতকে আসল সম্বল হিসেবে গ্রহণ করে তখন তার বিপর্যয় ঘটতে থাকে। ইসলামী বিধানে ইমাম, মোয়াজ্জিন ও উপদেষ্টাকে আমিন উপাধি দেয়া হয়েছে।
আল্লাহর সৃষ্টি অসংখ্য ফেরেশতা আমানতদারঃ জিব্রাইল, মিকাইল, ইস্রাফিল, আজরাইল প্রমুখ ফেরেস্তা আমানতদারির ব্যাপারে প্রসিদ্ধ। পবিত্র কুরআনে জিব্রাইলকে অনুগতশীল এবং আমিন বলা হয়েছে। আল্লাহ কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তারা বিন্দুমাত্র ত্রুটি করেন না। সে জন্য তারা সবাই আল্লাহর কাছে নির্দোষ। আমানতের মহান দায়িত্ব পালন করছেন বলে আল্লাহ জিব্রাইলকে ওহি বহনের কাজ অর্পণ করেন। সৃষ্টিলগ্ন থেকে যে ফেরেশতা যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তারা হুবহু দায়িত্ব পালন করছেন।
আল্লাহর নবী-রাসূলগণ আমানতদারঃ বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাঃ নবুয়ত প্রাপ্তির বহু আগে থেকেই আমানতদার ব্যক্তি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তার আগে প্রেরিত সব নবী-রাসূল আমানতদারির সুনাম অর্জন করেছিলেন। নিজ নিজ জাতির কাছে নিজেদের পরিচিতি পেশ করার সময় তারা বলেন, ‘ইন্নিলাকুম রাসূলুন আমিন’ আমি তোমাদের জন্য একজন আমানতদার রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।
আমানতদারির গুরুত্বঃ ১. আমানত রক্ষার ওপর নির্ভর করে দেশ, রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের উন্নতি। সম্ভাবনাময় জাতির জন্য আমানত একটি অপরিহার্য ব্যাপার।
২. আমানতদারি না থাকলে জাতির বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। বর্তমানে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ধ্বংসের একমাত্র কারণ আমানতের খেয়ানত, আত্মসাৎ, লুটতরাজ, অবৈধ উপার্জন ইত্যাদি।
৩. সমাজের মধ্যে ঐক্য, সংহতি, হৃদ্যতা, আন্তরিকতা, সহমর্মিতা, স্নেহ-মমতা, ভালোবাসা সৃষ্টির মূল হলো আমানতদারি। পরস্পরের আস্থা প্রতিষ্ঠার একটি মাত্র উপায় হলো আমানতদারি।
৪. পারিবারিক জীবন হোক অথবা ব্যক্তিগত জীবন, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত, শিল্প-কারখানা, হাটবাজার, ব্যবসায়-বাণিজ্য সব ক্ষেত্রে আমানতদারি বিশেষ প্রয়োজন। এগুলোর পাশাপাশি আমাদের হাত, পা, চোখ, কান, জিহ্বা, পাকস্থলী, বুক ইত্যাদি অঙ্গ-প্রতঙ্গ আমানত হিসেবে দেয়া হয়েছে। এ সবের ব্যবহারের বেলায় আমানতদারি পালন করা প্রয়োজন। কুখাদ্য-ধ্বংসাত্মক খাদ্য থেকে শরীর ও স্বাস্থ্য রক্ষা করা, রোগের চিকিৎসা করা আমানতদারি।
৫. এ ভূমণ্ডলে মানবজাতির শান্তি ও উন্নতি সাধনের লক্ষ্যে সব মানবরচিত বিধিবিধানের পরিবর্তে এক আল্লাহর জীবনবিধান চালু করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমানত।
ভোট একটি আমানতঃ রাষ্ট্র পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের সাথে জাতীয় সংসদে সৎ, যোগ্য, বিচক্ষণশীল, প্রজ্ঞাবান, মুত্তাকি ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তিকে নির্বাচিত করে পাঠানো একটি বড় আমানত। অতএব দেশের প্রতিটি ভোটার আমানতদার। আমানতের সঠিক প্রয়োগ না করার অর্থ বড় ধরনের খেয়ানত করা, যা দেশ ও জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।
সংবাদ সংগ্রহ এবং তথ্য সরবরাহ একটি আমানতঃ মিডিয়া বা সংবাদমাধ্যম জাতি ও সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ অবদান রখে। যেকোনো ভুল তথ্য ও মিথ্যা সংবাদ সরবরাহের কারণে একটি দেশের ভিত নড়বড়ে হতে বিলম্ব হয় না। বিরাট হুমকির সম্মুখীন হতেও সময় লাগে না। সুতরাং সঠিক তথ্য সরবরাহ ও সংগ্রহ একটি বড় আমানত। অন্যভাবে বলতে গেলে সাংবাদিকতা একটি বড় আমানত। এই আমানতের খেয়ানত দেশ ও জাতির কাম্য হতে পারে না। পবিত্র কুরআনে তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহের সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে আল্লাহ বলেছেন, হে মুমেনগণ, কোনো অনৈতিক ব্যক্তি যখন তোমার কাছে সংবাদ বহন করে থাকে, তখন তুমি সেটা ভালো করে যাচাই-বাছাই করো। (তারপর তার ওপর আমল দাও) যাচাই-বাছাই ছাড়া সংবাদে আমল দেয়ায় একটি জাতি সমূলে বিপর্যস্ত হতে বাধ্য, তখন তোমাদের আক্ষেপ করা ছাড়া কিছু করণীয় থাকবে না। (সূরা হুজুরাত-৬)
ভেজাল খাদ্য, কুখাদ্য, কৃত্রিম সঙ্কট, মূল্যবৃদ্ধি বড় খেয়ানতঃ ইসলামে ব্যবসায়ীদের যথেষ্ট মর্যাদা দেয়া হয়েছে। আল্লাহর রাসূল সাঃ বলেছেন, সৎ ও আমানতদার ব্যবসায়ী কিয়ামতের ময়দানে আমার সঙ্গ লাভ করবে।
আমানত রক্ষায় ইসলামী বিধানঃ আমানত রক্ষায় ইসলামের বিধান হচ্ছে আমানতের হেফাজত করা। খেয়ানত না করা। যার জিনিস তার কাছে হুবহু পৌঁছে দেয়া। কুরআনে বলা হয়েছে­ ‘হে ঈমানদাররা, তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের সাথে খেয়ানত করো না। তোমরা কী করে খেয়ানত করতে পার, অথচ তোমরা অবগত।’ (সূরা আল-আনফাল-২৭) অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দেয়া যাবতীয় বিধানগুলোর অমান্য করাই খেয়ানত। সূরা নিসার প্রসিদ্ধ আয়াতে আল্লাহ আমানতের হকদারদের আমানত দিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। (আয়াত ৫৮) গচ্ছিত জিনিসের মধ্যে কোনো ধরনের পরিবর্তন বৈধ নয়। এখানে তিনটি মৌলিক গুণ আমানতদারের মধ্যে থাকতে হবে। ১. আমানত যার কাছে রাখা হয় তাকে পবিত্র নিষ্ঠাবান হতে হবে। ২. আমানত রক্ষার ব্যাপারে সার্বিক দায়দায়িত্ব পালন করতে হবে। ৩. আমানতের হুবহু জিনিসটি মালিকের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। ‘যে আমানত রক্ষার ব্যাপারে স্বচ্ছ না, সে মুমিন নয়’। অন্য হাদিসে আল্লাহর নবী সাঃ বলেছেন, ‘আমানতের খেয়ানতকারী ইসলামচ্যুত গণ্য হবে।’ রাসূলুল্লাহ সাঃ আমানত লঙ্ঘনকারীকে মুনাফেক সাব্যস্ত করেছেন। কোনো লোক নেক আমল করা সত্ত্বেও আমানতের খেয়ানতের কারণে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন না। হাশরের মাঠে তিনি আমানত আদায়ের জন্য হুকুম দেবেন। হাদিসে বর্ণিত, ‘এক ব্যক্তি আল্লাহর পথে শাহাদতবরণ করেন, কিন্তু সে মানুষের আমানত না বুঝিয়ে মারা যান। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে বলবেন, মালিকের কাছে আমানত ফেরত দাও। কিন্তু সে মালিককে খুঁজে পাবে না। তখন আমানতের বোঝা তার মাথায় চাপিয়ে দিয়ে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। এ লোক বান্দার অধিকার নষ্ট করার কারণে জাহান্নামের ভাগী হলো।
বনি কোরাইজা যুদ্ধের সময় আল্লাহর নবী সাঃ কোরাইজার ইহুদিদের সাথে সংলাপের জন্য আবু লুবাবা ইবনুল মুনজের রাঃ-কে সেখানে পাঠালেন। সংলাপ চলাকালীন সময়ে তিনি আকার ইঙ্গিতে কথায় আমানত রক্ষা করতে পারেননি বলে নিজ অপরাধ স্বীকার করে রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর দরবারে হাজির হন। এক পর্যায়ে তিনি তওবা মাফের লক্ষ্যে মসজিদে নববির একটি খুঁটির সাথে নিজেকে বেঁধে দিলেন। তিন দিন অনবরত তওবা করার পর আল্লাহর পক্ষ থেকে তার ক্ষমা ঘোষিত হওয়ার পর আল্লাহর নবী সাঃ স্বহস্তে তার বাঁধনটি খুলে দিলেন। মসজিদে নববির ভেতরে আবু লবাবা খুঁটিটি এই নামে এখনো বিদ্যমান আছে, যা আমানতের খেয়ানত করার পরিণাম সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ নবুয়তের মহা আমানত পালন করার ব্যাপারে বিদায় হজের ভাষণে সমবেত হাজার সাহাবির সাক্ষ্য গ্রহণ করে বললেন, বল তো তোমরা, আমি কি আমানতের হক আদায় করতে পেরেছি? উপস্থিত সবাই একযোগে জবাব দিলেন, আপনি রিসালাত ও আমানতের অর্পিত দায়িত্ব সম্পূর্ণ পালন করেছেন। তখন আল্লাহর নবী হাতের শাহাদাত আঙুল ওপরের দিকে উত্তোলন করে বললেন, হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাকো। আমানত রক্ষা প্রসঙ্গে ইসলামের ইতিহাসে বহু ঘটনা রয়েছে।
মানুষ কখন আমানতের খেয়ানত করে? আমানতের খেয়ানত করা হয় কয়েকটি কারণে।
যেমনঃ ১. ইসলামী শিক্ষা ও আদর্শের জ্ঞানের অভাব। ২. নৈতিকতার অভাব। ৩. ধন-সম্পদের লোভ। ৪. পরকালের জবাবদিহিতার অনুভূতির অভাব। ৫. হঠকারিতা, অহমিকা ও দাম্ভিকতা।
আমানতদারির অনুভূতি সৃষ্টির উপায়ঃ ১. হালাল উপার্জন, ২. পরকালের জবাবদিহিতার স্মরণ, ৩. ঈমান ও আমলে সালেহ মনে নিয়োজিত থাকা, ৪. মনের তুষ্টি ও তৃপ্তির অন্বেষণে থাকা, ৫. সবসময় ইস্তেগফার করতে থাকা, ৬. সবসময় আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে থাকা।


ড. হাসান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন

শুক্রবার, ২ জানুয়ারি, ২০০৯

ইসলামে সামাজিক দায়বদ্ধতা


ইসলামে সামাজিক দায়বদ্ধতা


পৃথিবী বাস উপযোগী হতেই মহান আলস্নাহ্‌তায়ালা মানুষকে প্রেরণ করেন এ জগতে। তখন তারা নতুন পরিবেশে পরিবার সৃষ্টি করে বিবাহের মাধ্যমে। আর পরিবারের বিস্তৃতিতে গড়ে ওঠে সমাজ। মানুষ নিজের অস্তিôত্বের কারণেই সমাজবদ্ধভাবে জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। ওই সমাজবদ্ধ জীবন-যাপনে নানা ভাবে উদ্বুদ্ধ করেছে ইসলাম। কালক্রমে বংশবৃদ্ধির কারণে মানুষের মাঝে সামাজিক দায়িত্ব কর্তব্য বহুলাংশে বেড়ে যায়। সে চাহিদা মেটাতেই সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতি সর্বাধিক গুরম্নত্ব প্রদান করেছে ইসলাম।
সামাজিক জীবন-যাপনে অনেক নিয়ম-কানুন ও পদ্ধতি প্রতি পালন করতে হয়; কর্তব্য কর্ম দায়িত্বসমূহ নিষ্ঠার সাথে অনুশীলন করে প্রতিনিয়ত তৎপর হওয়া অপরিহার্য। আর এরই মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন ঘটে থাকে। তবে ইসলাম আবির্ভাবের পূর্বে তা বেশিকাল টেকেনি। তখনকার সামাজিক দায় টেকশই না হওয়ায় মানুষ সামাজিকভাবে বিভ্রান্তিতে পড়ে। আর তারা হয়ে পড়ে পরস্পরে বিচ্ছিন্ন। আরব জাতি তখন তিনশত গোত্রে বিভক্ত একটি জাতিতে পরিণত হয়। জীবনপ্রবাহকে সে সময় বিশৃঙ্খল করে তোলে। সে কারণে সমাজে হানাহানি, শত্রম্নতা প্রকটরূপে দেখে দেয়। মানুষ অন্য মানুষের প্রভু হয়ে বসে পেশীশক্তির বলে।
আরবের অরাজক এক অবস্থায় বিশ্ব নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর আবির্ভাব ঘটায় নবুয়্যতলাভের পর ইসলামের দাওয়াত মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে মানুষের উপর মানুষের প্রভূত্বকে উৎখাত করেন এবং এক আলস্নাহ্‌র প্রভুত্বের ভিত্তিতে এক নতুন সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করেন। সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে তিনি (সাঃ) ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠায় গুরম্নত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। তৎকালীন বিশৃঙ্খল আরব জাতিকে সুসংগঠিত করে বিশৃঙ্খল জীবন-প্রবাহ থেকে সুশৃঙ্খল সমাজ ব্যবস্থায় নিয়ে আসেন। তিনি অনুকরণযোগ্য নিয়ম-কানুন, নীতি-পদ্ধতি সুসংগঠিত সমাজ গঠনে প্রতিষ্ঠা করেন।

নবী করীম (সাঃ) -এর প্রদর্শিত সমাজ ব্যবস্থায় নিজেদের টিকিয়ে রাখতে হলে পরিবার ও সমাজে মিলেমিশে থাকতে হবে। ওই মিলেমিশে থাকার মাঝে শান্তিô আর শান্তি, সুখ আর আনন্দ। পবিত্র কোরআনের সূরা-নাহ্‌ল-এর ২৮ আয়াতে আছে ‘আমরা কোন মন্দ কর্ম করতাম না’। এবং নিশ্চয়ই তোমরা যা করতে সে বিষয়ে আলস্নাহ সবিশেষ অবহিত।” মানুষের উচিত নয় নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। সূরা-নাহ্‌ল-এর ১৯ আয়াতে আছে “তোমরা যা গোপন রাখ এবং যা প্রকাশ কর আলস্নাহ তা জানেন”। সমাজে তথা পৃথিবীতে যারা অশান্তি সৃষ্টি করে তাদের জন্য আলস্নাহ সূরা আল বাকারার২৭ আয়াতে হুঁশিয়ারী দিয়েছেন-এভাবে- ‘যে সম্পর্ক অড়্গুণ্ন রাখতে আলস্নাহ আদেশ করেছেন, তা ছিন্ন করে এবং দুনিয়ায় অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায় তারাই ড়্গতিগ্রস্ত।’ এছাড়াও সূরা-রা’দ এর২৫ আয়াতে আলস্নাহ্‌ ইরশাদ করেছেন, ‘যে সম্পর্ক অড়্গুণ্ন রাখতে আলস্নাহ আদেশ করেছেন, তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের জন্য আছে লা’নত এবং তাদের জন্য আছে মন্দ আবাস।’ উলেস্নখিত আয়াত সমূহ থেকে আমরা অবহিত হলাম অশান্তি সৃষ্টি, সম্পর্ক ছিন্ন করা সমাজিক দায়বদ্ধতার পরিপন্থী ও ধ্বংসের পথে ধাবিত হওয়ার সামিল। যারা ঈমান এনেছে, অর্থাৎ হয়েছে মুসলমান, তারা আলস্নাহ্‌র নির্দেশ, নবী করীম (সাঃ) এর পরামর্শ থেকে অন্য পথে যেতে পারে না। তাইতো সূরা আল বাকারার ৮৩ আয়াতে আলস্নাহ্‌ ইরশাদ করেন, ‘মাতা-পিতা, আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন ও দরিদ্র্যদের প্রতি সদয় ব্যবহার করবে এবং মানুষের সঙ্গে সদালাপ করবে, সালাত কায়েম করবে ও যাকাত দিবে---’। অন্যত্র ৮৪ আয়াতে আছে--- ‘তোমরা পরস্পরে রক্তপাত করবে না এবং আপনজনকে স্বদেশ হতে বহিষ্কার করবে না’,--। সূরা তাহ্‌রীম -এর ৬ আয়াতে আলস্নাহ ইরশাদ করেছে ‘হে মু’মিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার পরিজনকে রড়্গা কর দোজখ হতে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর’।

হ্যাঁ, ওই দোজখের আগুন থেকে বাঁচার জন্যই সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতি অবশ্য যত্নবান হতে হবে, সতর্ক থাকতে হবে সামাজিক দায়বদ্ধতা যেন আমাদের কোনরকম আচরণে ক্ষুণ্ন না হয়। প্রতিটি মানুষকে তাই সর্বোত্তম আচরণের মাধ্যমে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখার প্রয়াস চালাতেই হবে। হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) বলেছেন, “সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে” (মিশকাত শরীফ)। হাদীসে আরো পাই “সেই ব্যক্তি মু’মিন হতে পারে না, যে ব্যক্তি নিজে পেট ভরে পানাহার করে, কিন্তু তার পার্শ্বেই প্রতিবেশী খাদ্যের অভাবে অভুক্ত থাকে।” (মিশকাত-বায়হানী)। তাই নবী করীম (সাঃ) -এর পরামর্শমতো চলতে হবে। আত্মীয়তার সম্পর্ক ঠিক রাখতে হবে জান্নাতে যেতে চাইলে এবং মু’মিন হতে হলে প্রতিবেশীর খোঁজ-খবর অবশ্যই রাখতে হবে। এ সবের জন্যই সামাজিক দায়বদ্ধতায় সকলের সাথে মিলেমিশে থাকতে হবে। নবী করীম (সাঃ) আদর্শ স্থানীয় ভাবে সকলের সাথে মিলেমিশে থাকতেন, স্বাতন্ত্র্য মর্যাদা বজায় রেখে চলতেন না। মাঝে মাঝে তিনি (সাঃ) হাসি-কৌতুকও করতেন। তবে সে কৌতুকও হতো সত্য কথায় বাস্তôবসম্মত। কাউকে কটাড়্গ করে বা অবাস্তব কথা বলে তিনি কৌতুক করতেন না (শামায়িলে তিরমিজী-১৫)। রাসূলে আকরাম (সাঃ) স্বীয় পরিবারের লোকদের ব্যাপারেও খুব লড়্গ্য রাখতেন। যাতে তার জন্য তাদের কোন রকম কষ্ট না হয়। এজন্য রাতে ঘর থেকে বের হওয়ার প্রয়োজন হলে অত্যন্ত ধীরস্থির ভাবে উঠে জুতা পরিধান করতেন এবং নিঃশব্দে দরজা খুলে বের হতেন। অনুরূপ ভাবে ঘরে প্রবেশ করার সময়ও নিঃশব্দে প্রবেশ করতেন, যাতে কারো ঘুমের কোন প্রকার ব্যাঘাত না ঘটে (মিশকাত-১৮১-১৮২)।

নবী করীম (সাঃ) পারিবারিক দায়িত্ববোধ থেকে এবং সামাজিক কর্তব্য থেকেও দিনের সময়কে তিন ভাগ করে এক ভাগ আলস্নাহর ইবাদত ও দ্বীনের কাজ, একভাগ পরিবার -পরিজনের খোঁজ খবর নেয়ার জন্য এবং আর এক ভাগ ব্যক্তিগত কাজ ও নিজের শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখার জন্য নির্দিষ্ট করে নেয়ার তালীম দিতেন (উসওয়ায়ে রাসূলে আকরাম, ১০৪)। একবার ক’জন সাহাবীর সাথে আলাপ করলে নবী (সাঃ) বলছিলেন, ‘জিবরাইল (আঃ) প্রতিবেশীদের সাথে কি ধরণের সম্পর্ক থাকা উচিত এবং তাদের প্রতি, দায়-দায়িত্ব পালনে কেমন আচরণ করা উচিত সে বিষয়ে গুরম্নত্বের পরামর্শ দিতে গিয়ে শেষপর্যন্ত সম্পদের অংশীদারিত্ব দিয়ে দিতে বলেন কিনা তেমন চিন্তায় পড়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে ধরনের পরামর্শ আসেনি। এ থেকে প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্কের গুরম্নত্ব অনুধাবন করা যায়।

কোন আত্মীয়ের দুর্ব্যাবহার পেলে তাকে মাফ করে দিয়ে তার সাথে ভাল সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে (বুখারি শরীফ-২:৮৮৬১। অমন পরামর্শ আমাদের প্রিয় নবী (সাঃ)’র ছিল। প্রতিবেশীর প্রতি দায়-দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে নবী করীম (সাঃ)-এর প্রবল তাগিদ, তিনি বলেছেন- “সে আমার উম্মত নয়, ‘যে প্রতিবেশীর খোঁজ-খবর করে না।” তিনি এও পরামর্শ দিয়েছেন, পিতা-মাতা, স্ত্রী-সন্তôানসহ সকল আত্মীয়-স্বজন ও মুসলমানদের হক আদায়ে সচেষ্ট থাকতে হবে। মোট কথা, মানুষের হকের ব্যাপারে খুব বেশি ফিকির রাখা অবশ্যম্ভাবী, নতুবা সমস্ত ইবাদত বিফলে যাবে। ওই ‘হক’ হচ্ছে পারিবারিক-সামাজিক দায়বদ্ধতা। এ দায়বদ্ধতা থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখলে ব্যক্তির ইবাদতসমূহ কোন কাজে আসবে না।
মুসা (আঃ) আলস্নাহকে এক সময় বলেন, আলস্নাহ্‌ আমি তো তোমার জন্য ইবাদত করি, রোজা রাখি, তোমার নির্দেশ অন্তôর দিয়ে পালন করি, তুমি কি আমাকে ড়্গমা করবে না? তখন-এর জবাবে আলস্নাহ্‌ বলেন, তুমি নামাজ পড়ো দোজখের শাস্তি থেকে রড়্গা পেতে, রোজা রাখো আগুন থেকে রড়্গার ঢাল হিসেবে, ইবাদত করো তোমার কল্যাণের নিমিত্তে এগুলো সব তোমার নিজের জন্য আমার জন্য কিই বা করলে? হে আলস্নাহ্‌ তাহলে! তুমি কি মানুষকে ভালোবাসা দাও! মানুষকে ভালোবাস তবেই আমার জন্য কিছু করা হবে। এখানেও মানুষ তথা সামাজিকবৃন্দের প্রতি অশেষ গুরম্নত্ব প্রদান করেছেন আলস্নাহ রাব্বুল আলামীন। অন্যদিকে মুসলিম হাদীসে উলেস্নখ রয়েছে- “যে বান্দা তার ভাইয়ের সাথে শত্রম্নতা পোষণ করে সে ছাড়া প্রত্যেক মুমিন বান্দাকে মাফ করে দেয়া হয়।”

সমাজকে গতিশীল রাখার জন্য শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আদর্শও বাস উপযোগী সমাজ প্রতিষ্ঠায় মানুষের অনেক কিছু করনীয় রয়েছে। দায়বদ্ধতা নিয়ে তা করতে হবে। তাই সামজের মাঝে মানুষে মানুষে বিরোধ দেখা দিলে তা মিটিয়ে ফেলার প্রয়াস নিতে হবে। এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনের সূরা-শূরার ৪০ আয়াতে আছে” যে ড়্গমা করে দেয় ও আপোষ নিষ্পত্তি করে তার পুরস্কার আলস্নাহর নিকট আছে। আলস্নাহ জালিমদেরকে পছন্দ করেন না।’ অন্য এক আয়াতে (সূরা-শূরা-আয়াত-৪৫) আছে--- ‘ক্ষতিগ্রস্ত তারাই যারা নিজেদের ও নিজেদের পরিজনবর্গের ড়্গতিসাধন করেছে।’ জেনে রাখ জালিমরা অবশ্যই ভোগ করবে স্থায়ী শাস্তিô। সমাজকে সুদৃঢ় সহঅবস্থান এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার মধ্যে দায়বদ্ধতায় আবদ্ধ রাখতে হলে প্রয়োজন ধৈর্য ও ড়্গমা।

সমাজে নানারকম বৈষম্য দেখা যায়। বৈষম্যের কারণে মানুষে মানুষে নানারকম অবস্থার সৃষ্টি হতে থাকে। ফলে সমাজ হয়ে পড়ে বন্ধনহীন, ওই বন্ধন অটুট রাখার লড়্গ্যে আলস্নাহ পাক ইরশাদ করেছেন- ‘যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় ব্যয় করে (দান খয়রাত দেয়, অপরকে সাহায্য করে) এবং যারা ক্রোধ সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ড়্গমাশীল; আলস্নাহ্‌ সৎকর্মপরায়ণদেরকে ভালোবাসেন, (সূরা-আল-ইমরান-আয়াত-১৩৪১)। সামাজিকদের মাঝের বৈষম্য দূর করার মাধ্যমে মনুষ্য সমাজের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতা প্রতিপালন এভাবেই করা অবশ্যই সম্ভব। আর এর ফলে মানুষে মানুষে সম্পর্কের বন্ধন মজবুত হয়। এর পাশাপাশি হাদীসে আছে-অন্যের রক্ত, সম্পদ ও ইজ্জত তোমার কাছে পবিত্র আমানত, এর খেয়ানত করা হারাম।’ হাদীসে সামাজিকতাকে অনেক গুরম্নত্ব দেয়ায় আমরা সেখানে পাই- ‘যে বড়দের সম্মান করে না, ছোটদের স্নেহ করে না, সে আমার উম্মত নয়’। এর চাইতে শক্ত কথা আর কি হতে পারে। এ হাদীস থেকে এ কথাই প্রতীয়মান হয় সমাজকে আদর্শের রজ্জুতে বাধতে হলে এ ধরনের কাজ সকলকে অবশ্যই করতে হবে। তাহলে সমাজের প্রবহমানতা স্বচ্ছভাবে বিদ্যমান থাকবে।

‘মানবতার সেবায় যিনি নিজের জীবন নিঃশেষে বিলিয়ে দিতে পারেন, তিনিই মহামানব। যার থেকে (প্রতিবেশীর) ড়্গতির কোন আশঙ্কা নেই তিনি উত্তম একজন মানুষ, ঈমানদার একজন মানুষ।’ হাদীসের এসব বাণীতে সামাজিকতার প্রতি কতটা গুরম্নত্ব দেয়া হয়েছে তা উপলব্ধি করতে কষ্ট হয় না। এমনকি বিপদগ্রস্তেôর পাশে দাঁড়াতে হাদীসে তাগিদ রয়েছে। এও বলা হয়েছে, ‘রোগীর সেবা ও শুশ্রূষাকারী নিজ গৃহে ফিরে না আসা পর্যন্ত বেহেস্তের পথে চলতে থাকে’। মানবতার অনুরূপ সেবা সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বলতম উলেস্নখযোগ্য দৃষ্টান্ত। স্বজনত্যাগীর পরিবারে আলস্নাহর রহমত অবতীর্ণ হয় না। তাইতো হাদীসে এসেছে -“সকল মুসলমান (সম্মিলিতভাবে) যেন একটি প্রাচীর, যার প্রতিটি অংশ বাকি অংশগুলোকে দৃঢ় করে। এমনিভাবে তারা নিশ্চয়ই প্রতিষ্ঠিত হবে একে অন্যের সহায়তায়”। ‘মুসলমান ভাইকে মুসলমান ভাই সাহায্যে করবে, সে অত্যাচারিত হোক বা অত্যাচারী হোক’। কিন্তু সে অত্যাচারী হলে কিভাবে আমারা সাহায্য করব? রাসূলে আকরাম (সাঃ) বললেন, ৈ‘তাকে অত্যাচার করা থেকে নিষেধ ও নিরস্তô করবে’। মানুষের সাথে আচরণে শিষ্টতা, কর্মে ধীরতা ও সর্ব বিষয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন নবূয়াতের চব্বিশ ভাগের এক ভাগ’। ওই মানুষ (মুসলমান) জনসাধারণের সাথে মিশে তাদের সৃষ্ট অসুবিধাগুলো সহ্য করে, সে তার চেয়ে উত্তম যে তাদের সাথে মেশে না ও সহ্য করে না।’ এছাড়াও বলা যায় ৈ‘লোকে তোমাদের ভাল করলে তোমরা তাদের ভাল করবে, আর তারা তোমাদের পীড়ন করলেও, তোমরা তাদের পীড়ন করবে না।’ জ্ঞাতিদের উপকার করা, তারা না করলেও’। সেইসাথে লোকজনের সঙ্গে, নম্র ব্যবহার করবে, কঠোর হবে না; তাদের প্রফুলস্ন করবে, নিন্দা করবে না।’ এ সকল হাদীস মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা রেখে থাকে। ফলে সামাজিক সহঅবস্থান আরো ভাল হয়, সম্পর্কের বন্ধন হয় অটুট।
মুসলমানদের গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে ভাগ হতে বলেননি, বরং ধ্বংসের/বিনাশের হাত থেকে বাঁচার জন্য নবী করীম (সাঃ) ও তাঁর প্রিয়জনের অনুগামী থাকার মতাদর্শে সংলগ্ন থাকারই জন্য সতর্কতা প্রদান করেছেন। এ ব্যপারে আলস্নাহ্‌ পাক ইরশাদ করেছেন- ‘তোমরা সকলে আলস্নাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হইও না। তোমাদের পতি আলস্নাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর, তোমরা ছিলে পরস্পর শুত্রম্ন এবং তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতির সঞ্চার করেন, ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই হয়ে গেলে। তোমরা তো অগ্নিকুণ্ডের প্রান্তেô ছিলে আলস্নাহ তা থেকে তোমাদের রড়্গা করেছেন”---

আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করতে হলে সামাজিক দায়বদ্ধতাকে অনুশীলনের প্রয়াস ঐকান্তিôকতার সাথে চালাতে হয়।”
মূলকথা হচ্ছে ইসলামের গুরম্নত্বনুযায়ী মহানবী (সাঃ)- এর জীবনাদর্শ ও শিড়্গাকে অনুশীলন করে সামাজিক দায়বদ্ধতার গুরম্নত্বকে যথাযথ অনুধাবনের মাধ্যমে জীবন-যাপন করতে হবে। দুনিয়ার সুখ-শান্তি অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে আমাদের সকল প্রকার বিদ্বেষ, ঈর্ষা ভুলে গিয়ে আত্মীয়-স্বজন ও সামাজিকবৃন্দের সাথে সুসম্পর্ক গড়ায় আরো সর্তক, সচেতন ও আন্তরিক হওয়া সমীচীন!

জাহাঙ্গীর হাবীব উলস্নাহ

মুজাদ্দিদ-ই-আল্‌ফ-ই-সানি

মুজাদ্দিদ-ই-আল্‌ফ-ই-সানি


শেখ আহমেদ শিরহিন্দী একজন মহান মরমী চিন্তাবিদ। তিনি সাধারণত মুজাদ্দিদ-ই-আল্‌ফ-ই-সানি নামে ব্যাপকভাবে পরিচিত। ইসলামের পুনরম্নজ্জীবনকারী হিসেবে তাঁকে অভিহিত করা হয়। ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম ধর্ম প্রচারিত হওয়ার পর তা’ একটি ভিন্নরূপ ধারণ করে। এখানে এসে ইসলাম বিভিন্ন ভাবধারার সাথে সংমিশ্রিত হয়ে পড়ে। প্রকৃতপড়্গে, ভারত সুফীবাদের সক্রিয় কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং এখানে বহু উপদলেরও সৃষ্টি হয়। কালের গতিতে সুফীবাদ মানুষের মনে এত বেশি প্রভাব ফেলে যে তারা ইসলামের সত্যিকার ভাবধারা থেকে কিছুটা বিচ্যুত হয়ে পড়ে। সময়ের অগ্রগতিতে বহু অনৈসলামি ভাবধারা ইসলামে প্রবেশ করে। মুসলমানগণ বহু কুসংস্কারে বিশ্বাস করতে শুরম্ন করে এবং মরমীবাদের বহু সম্প্রদায়েরও উদ্‌ভব ঘটায়। ফলে ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, এমন কি জীবন সম্পর্কে সমগ্র ধারণারও পরিবর্তন হতে শুরম্ন করে।

ইসলামের এহেন অবস্থার মধ্যেই আর্বিভাব ঘটে মহান ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও সুফি মুজাদ্দিদের। তিনি ইসলামি মরমীবাদের নব দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করেন এবং মূল ইসলামকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি এমন এক সময়ে আবিভূêত হন যখন প্রায়োগিক ধর্ম হিসেবে ইসলাম তার মূল প্রাণশক্তি ও গতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। সুফি ও সাধারণ মানুষ ইসলামের মূল ভাবধারার চেয়ে এর আচার ও আনুষ্ঠানিকতাকে ঘিরেই জড়িত থাকে। ইসলামের মূল উৎস কোরআন ও হাদীসকে উপেড়্গা করা হয়। অন্ধ ও আচারি ভাবধারা বিরাজ করতে থাকে এবং ইসলামের মূল ভাবধারাকেও খর্ব করা হয়। ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় অনুভূতির দুর্বলতার জন্য ইসলামকে ধর্মীয় প্রভাব থেকে মুক্ত করার সম্রাট আকবরের নীতিও এজন্য অনেকাংশ দায়ী ছিল। মুজাদ্দিদ তাকলিদ (কর্তৃত্বের অন্ধ অনুকরণ)-এর বিরোধী ছিলেন। তিনি ধর্মীয় মতবাদের ব্যক্তিগত বোধ ও ব্যাখ্যায় বিশ্বাসী ছিলেন।

সময়েরই প্রয়োজন ছিল ইসলামের একজন সত্যতা প্রতিপাদনকারী ব্যক্তির আবির্ভাবের। ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই মুজাদ্দিদের আবির্ভাব ঘটে। তিনি তৎকালীন অনৈসলামি ভাবধারার বিরম্নদ্ধে রম্নখে দাঁড়ান এবং তাঁর পুনরভ্যুদয়ের ক্রিয়া-তৎপরতার দ্বারা বৈপস্নবিক পরিবর্তন আনয়ন করেন। সুফিদের সর্বেশ্বরবাদী মতবাদের বিরম্নদ্ধে তিনি বলেন, আলস্নাহ ও জগৎ ভিন্ন, তারা এক নয়। ধর্মতত্ত্ববিদগণের বিরম্নদ্ধে তিনি বলেন যে, মুসলমানদের কোরআন ও হাদিসে ফিরে যেতে হবে। তৎকালীন দূষিত প্রভাব থেকে ইসলামকে মুক্ত করার জন্য তিনি সুদূর গ্রামাঞ্চলে প্রচারকবৃন্দকে প্রেরণ করেন। তাঁরা সেখানে কোরআন ও হাদিসের মৌলিক শিড়্গা প্রচার করে বেড়ান।

যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি বিশ্বের সমস্ত মুসলিম পণ্ডিত ব্যক্তিকে তাঁর মতবাদের প্রতি আস্থাবান হওয়ার জন্য আবেদন জানান। তিনি জনগণের নিকট থেকে উৎসাহব্যঞ্জক সাড়া পান এবং ইসলামের পুনর্জাগরণের জন্য ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাঁর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা অনুভব করে সম্রাট জাহাঙ্গীর বিচলিত হয়ে উঠেন এবং অচিরেই তাঁকে কারারম্নদ্ধ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি মুক্তি পান এবং সম্রাটের বিশেষ পরামর্শক নিযুক্ত হন।

মুজাদ্দিদ কোরআন ও হাদিসের গুরম্নত্ব পুনরম্নজ্জীবন করতে সড়্গম হন যা থেকে জনগণ বিচ্যুত হয়ে পড়েছিল। তবে মরমীবাদে তাঁর অবদান ছিল বিপস্নবাত্মক। তিনি আলস্নাহ্‌ ও জগতের অভিন্নতার সর্বেশ্বরবাদীর ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন। পরবর্তীতে স্রষ্টা ও সৃষ্টি দ্বৈততা এবং আলস্নাহ্‌র অতিবর্তিতা (Transcendence) প্রতিষ্ঠিত হয়। নবী-পত্যাদেশ (ওহি) ও সুফীবাদের ভাবোচ্ছ্বাস (ইলহাম) এর মধ্যে প্রকারগত পার্থক্য নির্দেশ করা হয়। ইলমে বাতিন (গূঢ় রহস্যের জ্ঞান) এবং ইলমে জাহির (প্রকাশ্য জ্ঞান)-এর মধ্যে পার্থক্য করা হয়। এই অভিমতও ব্যক্ত করা হয় যে, অজ্ঞাত গূঢ়রহস্যকে জ্ঞাত অভিজ্ঞতাভিত্তিক ঘটনার দ্বারাই জানা যেতে পারে।

তবে, ইলমে বাতিন-২ জ্ঞানের জন্য সুফিকে হাদিস পাঠ ও অধ্যয়ন করতে হবে।

তাওহিদ বা আলস্নাহ্‌র একত্ব এবং এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তাঁর ধারণা ছিল অত্যন্ত গুরম্নত্বপূর্ণ। কারণ, তাঁর এই ধারণা ছিল আলস্নাহ্‌র সম্পর্কে সর্বেশ্বরবাদীর ধারণার বিপরীতে। তিনি সুফীদের প্রথমে হাদিস অনুসরণে উদ্বুদ্ধ করেন এবং তারপর যিকর (স্মরণ) ও ফিকর (অনুধ্যান) অবলম্বন করার পরামর্শ দেন। তন্ময়াবস্থা অর্জনের জন্য সুফীদের কর্তৃক গ্রহীত সঙ্গীত ও অন্যান্য চর্চাকে নিন্দে করা হয়। অলস অনুধ্যানের চেয়ে সক্রিয় সমাজসেবাকে উৎকৃষ্টতর বলে মনে করা হয়। কোরআন ও হাদিস অনুসরণে সকল প্রকার নবসংযোজন (বিদাত) নিন্দে করা হয়। মুজাদ্দিদ মনে করেন যে, ইমামদের অন্ধ অনুসরণের ফলেই কালের অগ্রগতিতে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ ও অনৈক্য সৃষ্টি হয়েছে এবং ইসলামের প্রকৃত ভাবধারা ও উৎস থেকে তারা বিচ্যুত হয়েছেন।


প্রফেসর এম এ হালিম

যৌতুক লেন-দেন বৈবাহিক সম্পর্ককে শিথিল করে


যৌতুক লেন-দেন বৈবাহিক সম্পর্ককে শিথিল করে


বিয়ে-শাদী এমন একটি পবিত্র বন্ধন ব্যবস্থা। যে ব্যবস্থার ফলে সুস্থ, সুসংহত এবং শান্তিপূর্ণ ভাবে জীবন-যাপন করার নিশ্চয়তা লাভ করে সমাজ। মানুষের পারিপাশ্বিকতাই মানুষকে সুস্থ মানুষ হিসাবে গড়ে তোলে। আর সুস্থ পরিবেশের প্রথম ধাপই হচ্ছে সংসার জীবন। শৈশবে পিতা-মাতার স্নেহ বন্ধন কাটিয়ে কৈশোরে পরবর্তীকাল অর্থাৎ যৌবনে নারী-পুরম্নষে বিয়ে বন্ধনের মাধ্যমে সংসার ধর্মে পদার্পণ করে।

বিয়ে বন্ধন ব্যবস্থা বিভিন্নভাবে সম্পূর্ণ হয়ে থাকে। ইসলাম ধর্মে বিয়ে বন্ধনকে অত্যন্ত উঁচু মর্যদায় অধিষ্ঠিত করা হয়েছে। বস্তুত ইসলামের সব ক’টি বিধানই নির্ভুল আর সর্বাঙ্গীন সুন্দর মানবতা, ন্যায় ও মূল্যবোধের বিশ্বজনীন পরম সত্যের ঘোষণা নিয়ে জীবনকে শুভ, পবিত্র ও সুন্দর করে গড়ে তোলার লড়্গ্যে ইসলামকে ব্যাপক গভীর এর সুদূর প্রসারী ভূমিকা রেখে এসেছে সে কথা বলাই বাহুল্য। অথচ এই শান্তিপূর্ণ বিয়ে বন্ধনের মাঝে অস্বস্তিôকর যে ব্যবস্থাটি আমাদের সমাজ শক্তভাবে আসন গেড়েছে- তা’হলো বিয়ে ব্যবস্থায় যৌতুক প্রথা।

কালের আবর্তে সমাজে এই যৌতুক ও পণপ্রথার জন্ম। এতে ইসলামে আলস্নাহর নির্দেশিত বিয়ে প্রথা চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। যৌতুকের ভয়াল গ্রাসে পিতা-মাতা হয়েছে সর্বশ্বান্ত ও কন্যাদায় গ্রস্ত। ইসলামে যৌতুক লেন দেনের স্থান নেই। প্রাকইসলামিক যুগে কন্যা সন্তানকে পিতৃ সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হতো। তাই পিতার সম্পত্তির একটা অংশ উপহার হিসাবে বিয়েতে প্রদান করা হতো। হিন্দু বিধান মতে এবং বিয়ের সময় কন্যাকে পিতার অর্থ সম্পদ যা যৌতুক হিসাবে এখন সমাজে প্রচলিত বিধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অনৈসলামিক বিধি ব্যবস্থা ও বিয়ে কর্মকান্ড থেকেই যৌতুক প্রথার উৎসারণ। অন্যদিকে আমাদের মুসলিম সমাজে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী নববধূর দ্রব্য সামগ্রী প্রথম পিতৃ গৃহ থেকে স্বামীর গৃহে গমনকালে প্রয়োজনীয় সাজ-সরঞ্জাম গহনাপাতি দান জেহজ রূপে প্রদান করা হয়। এখানে শর্ত জরবদস্তি কিংবা দর কষাকষির কোন বালাই নেই। স্ব-ইচ্ছায় ও সুন্তষ্ট চিত্তে এসব দান-জেহাজ দেয়া হয়ে থাকে। এছাড়া ইসলামে বিয়ে বন্ধনে মোহরানার গুরম্নত্ব অনেক। এটি ইসলামের জন্ম থেকেই মুসলীম সমাজে কড়াকড়িভাবে আরোপিত। মোহরানা কন্যার প্রাপ্য। এই মোহরানা কেবল বর কর্তৃক অনেকে স্বেচ্ছাকৃত উপহার হিসাবে প্রদান করা হয় বা স্ত্রীর নিজস্ব সম্পত্তি হিসাবে গণ্য হয়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, তোমরা নারী দিগকে মোহরানা প্রদান করো, সূরা নেসায় বলা হয়েছে, পুরম্নষরা নারীদের ভরণ পোষণ, লালন-পালন সংরড়্গণ তথা সবকিছুর জন্য দায়ী। আল-কোরআনে আরো সুস্পষ্ট ঘোষিত হয়েছে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে কোন কিছু দেয়াই রীতি সংগতভাবে বিয়ে শাদীর ক্ষেত্রে মোতৃরানা নির্ধারণি অতি অপরিহার্য। পবিত্র কোরআন, হাদীস এবং ফেকাহ শাস্ত্রবিদদের মতে, বিয়ে-শাদীতে মোহরানা প্রদান অত্যাবশ্যকীয় শর্ত। এখানে দরাদরি বা চাওয়া বা পাওয়া শরীয়তের বিধানে অনুপস্থিত।

প্রসঙ্গতঃ উলেস্নখ্য যে, বদর যুদ্ধে মালে গণীমতের অংশ রূপে হযরত আলী (রাঃ) যে বর্মটি পেয়েছিলেন তা বিক্রয় করে তিনি একশত পঁচিশ দেরহাম হযরত ফাতেমা (রাঃ) কে মোহরানা হিসাবে প্রদান করেন। হযরত আলী (রাঃ)-এর মোহরানা দেয়ার মতো কোন সম্পদ ছিল না। হযরত ফাতেমা (রাঃ) ও হযরত আলীর এই পবিত্র শাদী মোবারকে হযরত রাসূলে কারীম (সাঃ) স্ব-ইচ্ছায় প্রণোদিত হয়ে গৃহস্থালির কিছু সরঞ্জাম উপহার দেন। এখানে বিশেষভাবে অনুধাবনযোগ্য যে, হযরত রাসূলে পাক (সাঃ)-এর এই উপহারকে যৌতুকের পর্যায়ভূক্তকরণ নিঃসন্দেহে ইহা বোকামির নামান্তর মাত্র।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, মানব সমাজ আজ বিয়ে শাদীতে যৌতুকের শিকারে পড়ে যে বিষ্ময় তথা অভিশপ্ত, কলঙ্কজনক অধ্যায় সৃষ্টি করে চলেছে তা বলাই বাহুল্য। যৌতুক গ্রহণ ও প্রদান দণ্ডনীয় আইন থাকা সত্ত্বেও (অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বিবেচিত হওয়া সত্ত্বেও) এর ফাঁকে ফাঁকে যৌতুকী বিয়ে সম্পাদিত হচ্ছে। পরিণামে মা বোন হচ্ছে লাঞ্ছিত অনেকেই করছে আত্মহত্যা, চলছে নির্মম হত্যাযজ্ঞ। যদিও নারী সমাজ এ ব্যাপারে সোচ্চার হয়ে উঠেছে তথাপি পুরম্নষ সমাজের তথাকথিত স্বার্থান্বেষী মহলের মন মানসিকতার কোন পরিবর্তন লড়্গ্য করা যায় নি। যা অতীব দুঃখজনক। প্রসঙ্গতঃ আমি ব্যক্তিগতভাবে মনেকরি যৌতুক প্রতিরোধে দেশের গোটা আলেম সমাজই হচ্ছে নায়েবে রাসূল। সমাজ যখন বিপথগামী, পরস্পর হানাহানি দ্বন্দ্ব কলহে নিত্য-নিয়ত ব্যস্ত হয়ে পড়েছে তখন আলেম ওলামা ও ইমাম সমাজই এর প্রতিরোধে কেবল এগিয়ে আসতে পারে। এবং এজন্য বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ তাঁদের দ্বারাই বিয়ে-শাদীর কার্যাদা সম্পন্ন হয়ে থাকে। আমাদের প্রিয় ভূমি এই বাংলাদেশে প্রায় সত্তর হাজারের মতো গ্রাম রয়েছে- এতে রয়েছে লড়্গ লড়্গ মসজিদ -এবং প্রতিটি মসজিদে, রয়েছে ইমাম তথা আলেম সমাজ। এই কু-অভিশপ্ত প্রথা সমাজ থেকে উচ্ছেদের ব্যাপারে সঠিক কর্মকাণ্ড পথ নির্দেশনা অন্যদের থেকে অনেক অনেক বাস্তব সম্মত হবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। তাই আমি দেশের বৃহত্তর আলেম সমাজ নারী, ইমাম, পীর-মাশায়েখ এবং ইসলামী সামাজিক সংগঠনসমূহ তথা সরকারের কাছে কয়েকটি প্রস্তাব পেশ করছি।

(১) যৌতুক একটি বি-জাতীয় প্রচলন ও নারী নির্যাতনমূলক এক অভিশপ্ত প্রথা। এর বিরম্নদ্ধে গড়ে তোলার জন্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে ওয়াজ অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা, সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। (২) যৌতুক লেন-দেন হয় এমন বিয়েতে কালেমা বা খুতবা পাঠ না করিয়ে সামাজিকভাবে যৌতুকী বিয়ে বয়কট করতে হবে। (৩) ওয়াজ মাহফিল ও জুমআর খুতবার সময় যৌতুক যে শরীয়ত পরিপন্থি কু-প্রথা এবং এর কুফল ও পরিণতি সম্পর্কে জনসাধারণকে অভিহিত করাও যৌতুক বর্জন করার প্রতি মন-মানসিকতা তৈরি করা। (৪) নিজ নিজ এলাকার সর্বস্তরের সমাজ কর্মীদের নিয়ে একটি শক্তিশালী যৌতুক প্রতিরোধ কমিটি গঠন করতে হবে। (৫) যৌতুক বিরোধী আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের দাবী বিশেষ করে কবিন নামা ফরমে যৌতুকের কোন দাবী নাই এই মর্মে আদালতগ্রাহ্য হলফ নামায় স্বাড়্গর দানের দারা প্রবর্ত্তনের দাবী সরকারের কাছে তুলতে হবে। (৬) কন্যা দায়গ্রস্থ গরীব পিতা-মাতার বিয়েযোগ্য কন্যাদের বিয়ে সুসম্পন্ন করার জন্য ধনাঢ্য বিত্তবান ও সরকারের যৌথ ব্যবস্থাপনায় মহিলা কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করার দাবি করতে হবে। (৭) বেতার ও টিভি চ্যানেলসমূহে যৌতুক বিরোধী প্রচারণা ব্যাপকতর করতে হবে। এবং এর পরিণতিও কুফল সম্পর্কে জনসমড়্গে তুলে ধরতে হবে। (৮) এছাড়া অবিবাহিত শিড়্গিত যুবক দ্বারা যৌতুক লেনদেনকে চরম ঘৃণা করে তারা সমাজে যৌতুক বিহীন বিয়ে করে সমাজে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন। (৯) এ কথা স্মরণ রাখতে হবে যে, বিয়ে-শাদী মানব জীবনের একটি পবিত্রতম শুভ কাজ। ধর্মীয় নীতিমালায় যৌতুক বিয়ে শাদীর কোন স্থান নেই। যৌতুকী বিয়ে সম্পূর্ণ পরিহারযোগ্য। অতএব, দেশের আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ, মসজিদের ইমাম, কাজীসহ সুধী, বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক সাংবাদিক তথা দেশের প্রতিটি সচেতনশীল নাগরিকের উচিত, এই অশুভ চরম ঘৃণিত পরিহার- যোগ্য অভিশপ্ত কু-প্রথার বিরম্নদ্ধে সাধারণ মানুষের মনমানসিকতা গড়ে তোলা এবং এ দেশের পবিত্র ভূমি হতে যৌতুক শব্দটি চিরতরে বিদায় দেয়ার জন্য সকলকে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা চালানোর জন্যে জোর আহ্বান জানাচ্ছি।
উপসংহারে বলতে চাই, আসুন আলস্নাহ ও পরোকালে ভয় রেখে বিয়ে-শাদীতে যৌতুক লেন-দেন থেকে বিরত থাকি।

মাওলানা শাহ আবদুস সাত্তার

হিজরী নববর্ষের তাৎপর্য


হিজরী নববর্ষের তাৎপর্য


গত মঙ্গলবার ছিলো পয়লা মহররম, হিজরী নববর্ষের প্রথম দিন। হিজরী নববর্ষকে খোশ আমদেদ জানাই। হৃদয়ের সব উষ্ণতা দিয়ে তোমাকে গ্রহণ করি। তুমি কেবলই যুগে যুগে নয় শতাব্দীর পর শতাব্দী বিশ্বমুসলিমকে নতুন প্রেরণায় উদ্দীপ্ত করে আসছো। তোমাকে আমরা স্মরণ করি। তুমি এলে আমরা আত্মসচেতন হই। নিজেদের অস্তিত্ব খুঁজে পেতে চেষ্টা করি। দেখতে না দেখতেই আমাদের মাঝ থেকে কালের গর্ভে হারিয়ে গেল ১৪২৯ হিজরী। চলে এলো ১৪৩০ হিজরী। আমরা জানি হযরত ঈসা (আ·) এর তিরোধানের পর হতে খ্রীষ্টাব্দ গণনা করা হয়ে থাকে। আর মুহাম্মদ (সা·) এর মক্কা হতে মদীনায় হিজরতের দিন অর্থাৎ-৬২২ খ্রীষ্টাব্দ থেকেই হিজরী সালের গণনা করা হয়। হিজরী সালের ক্যালেন্ডার রসূল (সা·) এর সময় হতে প্রচলিত না হলেও তাঁর খলিফা আমিরম্নল মুমেনীন হযরত ওমর (রা·) এর শাসনামলে ১৭ হিজরী বা রসূলের ইন্তেকালের সাত বছর পর হতে এই হিজরী সনের প্রচলন করা হয়। সে সময় হযরত ওমর (রা·) অর্ধ পৃথিবীর শাসনকর্তা ছিলেন। তখন রাজ্যের বিভিন্নস্থানে চিঠিপত্র প্রেরণের ড়্গেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়। তাই তিনি সমসাময়িক সাহাবায়ে কেরামদের পরামর্শক্রমে এই কার্যক্রম পরিচালিত করেন। পৃথিবীতে আজ নানারকম আগ্রাসনে অসহায় মানুষ দিশাহারা। ধর্মগত, ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত প্রভাবে উন্নত দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছে। তা থেকে বের হয়ে আসার কোন উপায় যেন বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

যার কারণে হিজরী নববর্ষ নিয়ে কোন সাড়া-শব্দ নেই। মহররম আসে আমাদের পুরাতন বছরের জরাজীর্ণতাকে মুছে দিয়ে নতুনরূপে, নতুন স্বপ্নে ডানা মেলে, নতুন প্রত্যাশার ভেলায় চড়ে আজানাকে জানার, অচেনাকে চেনার ও দুরন্ত সাহসীকতার পথে নির্ভীক পথ চলার কল্যাণময় শুভ বার্তা নিয়ে। গভীরভাবে লক্ষ্য করুন যদি এই নববর্ষ নিরবে নিঃশব্দে চলে যায় তাহলে আমরা কিভাবে নতুন শপথ ও প্রত্যয় নিয়ে পথ চলবো? সবচেয়ে বড় কথা হলো- হিজরী সনের যে প্রেড়্গাপট তা যে কোন মুমিন মুসলামান হৃদয়ে নবী প্রেমের অকৃত্রিম ভালবাসা ও যশোগাঁথা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা কি হয়? হয় না তার কারণ আমরা হিজরী সনের মর্মকথা পটভূমি ও প্রেক্ষাপট জানি না, জানার চেষ্টাও করি না। সে দিন ছিল ১২ সেপ্টেম্বর ৬২২ খ্রীষ্টাব্দ। হযরত মুহাম্মদ (স·) মক্কা হতে মদীনায় হিজরত করেছিলেন আলস্নাহ তায়ালার নির্দেশে। কারণ পৃথিবীতে যত নবী রসুল এসেছিলেন সকল নবীও রসুলেরা নির্যাতিত হয়েছেন।

অনেকেই হিজরত করতে বাধ্য হয়েছেন। তেমনিভাবে হযরত মুহাম্মদ (স·) ৬১০ খ্রীষ্টাব্দে নবুওয়াত পাওয়ার পর আলস্নাহ অস্বীকারকারীদেরকে এক আলস্নাহর দিকে আহ্বান করেছিলেন তখন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় মানুষেরা বিরোধীতা শুরম্ন করেছিল। গোপনে গোপনে তিন বছর দাওয়াত দিয়েছিলেন। এর পর আলস্নাহর নির্দেশে সাফা পাহাড়ে প্রাকশ্যে এক আলস্নাহর উপর ঈমান আনয়নের ঘোষণা করেছিলেন। তখন থেকেই আরম্ভ হয়েছিল নির্যাতন। পথে প্রান্তে তাকে অপমানিত লাঞ্চিত করা হতো। নামাজরত অবস্থায় উটের নাড়ী ভুড়ি তাঁর পিঠের উপর চাপিয়ে দেয়া হতো। গমনা-গমনের পথে কাটা বিছিয়ে রাখা হতো। শিয়াবে আবু তালিব নামক শিবিরে দীর্ঘদিন বন্দি করে রাখা হয়েছিল। এরপর তার সঙ্গি সাথী সাহাবীদের উপর অমানুষিক নির্যাতন করা হচ্ছিল। তাদের মধ্যে উলেস্নখযোগ্য হলো হযরত খাব্বব (রা·), তালহা (রা·), আবদুর রহমান বিন আউফ (রা·), হযরত বেলাল (রা·) আম্মার ইয়াছির ও সুমাইয়া। হযরত বেলাল (রা·)কে তো মুরম্ন ভূমির উত্তপ্ত বালুকারাশির উপর চিৎ করে শোয়ায়ে বুকের উপর পাথর চাপা দিয়ে রাখা হতো। এই অবস্থায় অত্যাচারী উমাইয়া বিন খলফের চাবুকের প্রচন্ড আঘাতে তার গোটা শরীর জর্জরিত হয়ে যেত। হযরত আম্মার ইয়াছির, সুমাইয়া এদের উপরও এই নির্যাতনের ষ্টিম রোলার চালানো হয়েছে। কাফেলারা নবীজীকে শারীরিক নির্যাতনে যখন দ্বীনের দাওয়াত থেকে স্তôব্ধ করতে পারলোনা তখন মানুষিক নির্যাতন দেয়ার জন্য নানা রকম ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করতে লাগলো। তারা তাকে পাগল, কবি, জাদুকর ইত্যাদি বলে অপপ্রচার করতে থাকলো। কিন্তু কিছুতেই কোন কাজ হলো না। বরং মুহাম্মদ (স·) তাঁর মিশন সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকলেন। একদিন তারা নদওয়া নামক তাদের মন্ত্রণাগৃহে সকল গোত্র পতিদের একটি বৈঠক করলো। সেখানে তারা সিদ্ধান্ত নিল যে, “আমরা নানা রকম কৌশল করে মুহাম্মদ (সাঃ) কে ঠেকাতে চেয়েছি। কিন্তু সে তো থেমে থাকার লোক নয় বরং তার চেয়ে আমরা মুহাম্মদ (সাঃ) কে দুনিয়া হতে সরিয়ে দেই”। সকলে এই সিদ্ধান্তেôর উপর সমর্থন করলো, তারা সকল গোত্র হতে শক্তিশালী যুবকদের বাছাই করলো। তাদেরকে ঘোষণা দিল, ‘যে মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবন্তô অথবা মৃত দেহ এই নদওয়া গৃহে হাজির করতে পারবে। তাকে একশত উট পুরস্কার দেয়া হবে।” যেই কথা সেই কাজ। মক্কার সকল গোত্র হতে শক্তিশালী পাহলোয়ান যুবকেরা একত্রিত হয়ে শপথ নিয়ে বের হলো হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর বাড়ী ঘেরাও করে তাকে আজ রাতেই তাঁর জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটাবে।

এদিকে আলস্নাহতায়ালা তাঁর প্রিয় হাবিবকে নির্দেশ করলেন হে নবী মক্কার মানুষ আপনাকে চায় না। মদীনার মানুষেরা আপনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেড়্গা করছেন। আপনি মদীনায় হিজরত করে চলে যান। মহানবী (সাঃ) আলস্নাহতায়ালার এই ঘোষণা পাওয়ার পর রাতের অন্ধকারে নিজ বিছানায় হযরত আলী (রাঃ) কে শায়িত রেখে মদীনার পথে রওনা দিলেন। সাথী হিসেবে বন্ধু আবু বকর (রাঃ) কে সঙ্গে নেয়ার জন্য তাঁর বাড়ীর সামনে গিয়ে, আবু বকর! বলে একবার ডাক দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে আবু বকর (রাঃ) বেরিয়ে এলেন। এত তাড়াতাড়ি কিভাবে এলে? জিজ্ঞাসা করলেন হযরত (সাঃ)। আবু বকর (রাঃ) বললেন, ইয়া রাসুলুলস্নাহ (সাঃ)! যেদিন আপনি আমাকে বলেছিলেন, ‘ হে আবুবকর মক্কার কাফেলারা বড়ই ড়্গিপ্ত হয়ে উঠেছে। কবে কখন হয়ত মক্কা হতে মদীনায় হিজরত করতে হতে পারে। সেদিন হতে একটি রাতের জন্যও আমি বালিশে মাথা রেখে ঘুমাই নাই। কারণ আমি আরাম করে ঘুমিয়ে থাকবো আর কাফেরেরা আপনাকে ধাওয়া করবে আপনি আমাকে ডেকে ডেকে পাবেন না। কাফেরেরা আপনাকে আঘাত করবে, যখম করবে। আমি আবু বকর এটা সইতে পারবো না। মহানবী (সাঃ) বললেন আবু বকর! চলো আর নয় এখানে। কারণ আলস্নাহর নির্দেশ মদীনায় হিজরতে যাওয়ার।’ তারা চললেন মদীনা অভিমুখে। চলতে চলতে রাত শেষ হয়ে সুবহে সাদিক হয়ে গেল। রসুল (সাঃ) ও আবু বকর (রাঃ) তখন মক্কার অনতি দূরে সওর নামক পর্বতের সন্নিকটে। তারা ভাবলেন কাফেরেরা হয়ত তাকে বাড়ীতে না পেয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়বে। সুতরাং এখানে রাতে আত্মগোপন করে থাকা যাক। তারপর তারা কিছুটা নিবৃত হলে আবার রওনা দেওয়া যাবে। সে হিসেবে সওর পর্বতের একটি গুহার মধ্যে ঢুকলেন। এই গুহায় বিষধর সাপ ছিল। হযরত আবু বকরকে সাপে দংশন করেছিল। মহানবী (সাঃ) তাঁর মুখের থুথু বা লালা আবু বকরের ক্ষত স্থানে লাগিয়ে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে বিষ চলে গেল।

এদিকে সকাল পর্যন্ত কাফেরেরা রসূল (সাঃ)-এর বাড়ীর চুতুষ্পার্শ্বে ঘিরে থেকে তাকে বের হতে না দেখে বাড়ীতে ঢুকে পড়লো। তারা রসূল (সাঃ)-এর ঘরে হযরত আলী (রাঃ)-কে পেয়ে তাকেই জিজ্ঞাসা করলো -বল! মুহাম্মদ (সাঃ) কোথায়? হযরত আলী (রাঃ) বললেন, মুহাম্মদ (সাঃ) কোথায় সেটা তোমরা দেখ, আমি কি বলবো? এমতাবস্থায় কাফেরেরা সিদ্ধান্ত নিল-মুহাম্মদ (সা·) হয়ত মক্কা হতে মদীনার পথে রওনা দিয়েছে। সুতরাং আর কালড়্গেপন না করে এখনই চলো তা না হলে আমাদের শিকার হাতছাড়া হয়ে যাবে। তারা পথে প্রান্তেô না পেয়ে ভাবছে মুহাম্মদ (সাঃ) নিশ্চয়ই মক্কার আশে পাশে কোন গুহা অথবা অন্য কোন স্থানে আত্মগোপন করে আছে বিধায় কেবলমাত্র পথ নয় পাহাড়-পর্বত এর মাঝে গর্ত গুহা থাকলে সবই খুঁজতে হবে। এসময় কাফেরেরা রসূল (সাঃ) ও আবুবকর যে গুহায় ছিলেন সেদিকে আসছিল। দূর হতে তাদের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। হযরত আবু বকর (রাঃ) ভয় পাচ্ছিলেন। আর বলছিলেন, ‘হে মুহাম্মদ (সাঃ)! ঐ দেখুন শত্রম্নদের পদধ্বনি শোনা যায়। তারা হয়ত আমাদের ধরে ফেলবে।’ মহানবী (সাঃ) তাকে সান্তনা দিয়ে বললেন, ‘ভয় পেওনা আবুবকর! আলস্নাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ কুরআনে আলস্নাহতায়ালা এই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আয়াত নাযিল করেছেন, “ইজহুমা ফিল গারে, ইজ ইয়াকুলু লিসাহিবিহি লা তাহবান ইন্নালস্নাহা মাআনা” অর্থাৎ হে নবী (সাঃ) সেই সময়ের কথা স্মরণ করম্নন। যখন আপনি ও আপনার মহানবী গুহার মধ্যে ছিলেন আর আপনার সাহেবী বলছিলেন, ঐ দেখুন শত্র্র্রু আমাদের ধরে ফেললো! তখন আপনি বলেছিলেন ভয় পেওনা, আলস্নাহ আমাদের সঙ্গে আছেন’। তারপর আলস্নাহ কি করলেন? ঐ গুহায় মাকড়সা পাঠিয়ে দিলেন। তারা মুহূর্তের মধ্যে পুরা গুহার মুখ জাল বুনে ঘিরে ফেললো। একটি কবুতর পাঠিয়ে দিলেন। যে ডিম পেড়ে গুহার মুখে’তা দিতে থাকল।

কাফেলারা যখন ঐ গুহার পাশে এলো তখন একজন বললো, দেখ দেখ এই গুহাটিও দেখ। কারণ এখানেও তো তিনি থাকতে পারেন। অন্য একজন বললো, এই গুহায় যে মুহাম্মদ (সা·)নেই তা আমি নিশ্চিত বলতে পারি। কারণ গতরাতেই যারা এসেছে তারা যদি এই গুহায় ঢুকতো তাহলে মাকড়সার জাল ছেড়া থাকতো। আর যে গুহায় লোক থাকে তার মুখে কবুতর ডিমে তা দেয় কেমন করে? সুতরাং অন্যদিকে চলো। এরপর কাফেররা মক্কা থেকে মদীনায় যাওয়ার সকল পথে পাহারাদার নিযুক্ত করলো। কিন্তু মহানবী (সাঃ) এই গুহায় তিনদিন তিন রাত থাকার পর অচেনা-অজানা পথে লোহিত সাগরের তীর দিয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে চলতে থাকলেন। পথে আরবের বড় পীর সুরাকা মহানবী (সাঃ)কে হত্যা করতে এসে নিজেই মুসলমান হয়ে গিয়েছিল। বারিদা নামক অন্য আরেকজন পুরস্কারলোভী ৭০ জন দুর্ধর্ষ যোদ্ধাদের নিয়ে পথে দাঁড়িয়েছিল। তারাও মুসলমান হয়ে গিয়েছিল। এরপর মদীনায় পৌঁছলেন। মদীনার আবাল, বৃদ্ধ, বনিতা সকলে মহানবী (সাঃ)-কে স্বাগতম জানালেন। তাকে মদীনার মানুষেরা নেতা মেনে নিলেন। তিনি মদীনা রাষ্ট্রের অধিপতি হলেন। অনেকগুলি যুদ্ধ-বিগ্রহ হলো। সবশেষ মক্কা বিজয় হলো। সমগ্র আরব ভূ-খন্ডে ইসলামের আদর্শ, কুরআনের আলো প্রজ্বলিত হলো এবং তাঁর ইন্তেôকালের পর খলিফা হযরত ওমর (রাঃ) এর খেলাফতকালে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা হতে মরক্কোর রাবাত পর্যন্ত মুসলমানদের করতলগত হলো। এরপর ইসলামের মহিমা সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ল। যা কেয়ামত অবধি টিকে থাকবে। রাসুলুলস্নাহর (সাঃ)-এর হিজরতের এই প্রেড়্গাপট, পটভূমি যদি হিজরী নববর্ষে স্মরণ করা হয় তাহলে প্রতিটি মুমিন হৃদয়ের আমূল পরিবর্তন হতে পারে।
মাওলানা জাকির হোসাইন আজাদী

পবিত্র আশুরা ও ঐতিহাসিক কারবালার শিক্ষা


পবিত্র আশুরা ও ঐতিহাসিক কারবালার শিক্ষা


মহররম মাসের ১০ তারিখকে আশুরা বলা হয়। আরবি ‘আশারা’ অর্থ দশ। সেই সুবাদে ওই তারিখ আশুরা বলে উল্লেখিত হয়ে আসছে। কারো মতে, হিজরী ৬১ সনের ১০ মহররম ঐতিহাসিক কারবালার প্রান্তরে অত্যাচারী শাসক ইয়াজিদের বাহিনী কর্তৃক হজরত ইমাম হোসাইন রাঃ-কে যে নির্মমভাবে শহীদ করা হয়, সেই হৃদয়বিদারক মর্মান্তিক ঘটনা স্মরণেই পালিত হয় আশুরা। মহররমের ১০ তারিখ বা আশুরা যেসব কারণে তাৎপর্যমণ্ডিত, তা নিচে আলোকপাত করা হলো।
আল্লাহপাক এ তারিখে আসমান, জমিন, লওহে কলম সৃষ্টি করেছেন এবং এই ১০ মহররম মহাপ্রলয় বা কিয়ামত অনুষ্ঠিত হবে।
আল্লাহতায়ালা আদি পিতা হজরত আদম আঃ-কে ১০ মহররম দুনিয়ায় প্রেরণ করেন।
মুসলিম মিল্লাতের পিতা হজরত ইব্রাহিম আঃ ঈমানের মহা কঠিন পরীক্ষা দিতে নমরুদের অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন ১০ মহররম।
১০ মহররম খোদাদ্রোহী ফেরাউন বিপুল সেনাবাহিনী নিয়ে নীল দরিয়ার অতল তলে তুবে মরে আর হজরত মুসা আঃ বনি ইসরাইলদের নিয়ে পানির ওপর দিয়ে পার হয়ে যান।
হজরত ইউনুছ আঃ ৪০ দিন মাছের পেটে অবস্থানের পর ১০ মহররম নাজাত পেয়েছিলেন।
হজরত নূহ আঃ ৪০ দিনের মহাপ্লাবনের পর ১০ মহররম নৌকা থেকে বেলাভূমিতে অবতরণ করেন।
হজরত ঈসা আঃ ইহুদিদের অত্যাচার, নির্যাতন শূলদণ্ড থেকে মুক্তি লাভের জন্য সশরীরে চতুর্থ আসমানে উপস্থিত হন ১০ মহররম।
হজরত ইয়াকুব আঃ তাঁর হারানো ছেলে হজরত ইউসুফ আঃ-কে ফিরে পান এবং দৃষ্টিশক্তি আবার ফিরে পান ১০ মহররম।
ধৈর্য, সহনশীলতার মূর্ত প্রতীক হজরত আইউব আঃ ১৮ বছর কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত থেকে আল্লাহপাকের ইচ্ছায় ১০ মহররম আকস্মিকভাবে আরোগ্য লাভ করেন।
কাবাঘরের নির্মাণকাজে সম্পূর্ণ হয়েছিল এবং ঐতিহাসিক কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা সংগঠিত হয়, যা বিশ্বের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা।
কারবালার এই মর্মান্তিক ঘটনা দ্বারা হজরত ইমাম হোসাইন রাঃ মুসলিম জাতির জন্য এই শিক্ষাই রেখে গেছেন, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, রাজনীতিকে ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন করার অপচেষ্টা রোধের নিমিত্ত, কুরআনি শাসনের পরিবর্তে মানবরচিত শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন ঠেকানোর উদ্দেশ্যে, আল্লাহর জমিনে আল্লাহর খেলাফত প্রতিষ্ঠাকল্পে অত্যাচারীর হাত থেকে মজলুম জনগণকে রক্ষা করার নিমিত্ত, বাতিল মতবাদ রুখে দেয়ার মানসে, জীবনের সর্বস্তরে ইসলামী নীতিমালা বাস্তবায়নে সর্বশক্তি প্রয়োগ করতে হবে।

মাওলানা শাহ মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান

আশুরার সংস্কৃতিই আমাদের পথনির্দেশক


আশুরার সংস্কৃতিই আমাদের পথনির্দেশক


আশুরা হলো হিজরি সনের প্রথম মাস মহররমের দশম দিবস। এ দিবসটি মানবেতিহাসের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এ দিবসে বহু ঐতিহাসিক ও বিস্ময়কর ঘটনা সংঘটিত হয়েছে বিধায় এ দিবসটি খুবই তাৎপর্যমণ্ডিত। হাদিস শরিফে এসেছে, এ দিবসটি মহান আল্লাহর কাছে বছরের অন্যান্য সব দিবস থেকে অপেক্ষাকৃত মর্যাদাবান। এ দিনে রোজা রাখার জন্য হাদিস শরিফে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এর আগে বা পরে আরো একটি রোজা রাখার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে, যাতে ইহুদি জাতির সংস্কৃতির সাথে মুসলিম সংস্কৃতি একাকার হয়ে না যায়। এ কথার অন্তর্নিহিত অর্থ খুবই তাৎপর্যবহ।
পবিত্র আশুরার দিনে মহান আল্লাহ ভূমণ্ডল, নভোমণ্ডল, লওহ, কলম ও সাগর-মহাসাগর প্রভৃতি সৃষ্টি করেছিলেন। এ দিনে হজরত আদম আঃ ও হজরত হাওয়া আঃ-কে সৃষ্টি করা হয়েছিল। জান্নাত-জাহান্নাম এ আশুরার দিনে সৃষ্টি হয়েছিল। এ আশুরার দিনে আদম আঃ ও হাওয়া আ.-এর তওবা কবুল হয়েছিল। হজরত নূহ আঃ-এর কিশতি দীর্ঘ ৪০ দিন পর এ আশুরার দিনে জুদি পাহাড়ের চূড়ায় এসে থেমে যায়। এ দিনে হজরত ইদ্রিস আঃ-কে আসমানে উঠিয়ে নেয়া হয়। হজরত ইব্রাহিম আঃ-এর জন্ম এ দিনে হয়। এই দিনে তিনি জালিম নমরুদের বিশাল অগ্নিকুণ্ড থেকে মুক্তি লাভ করেন এবং খলিলুল্লাহ উপাধিতে ভূষিত হন। হজরত মূসা আঃ ৬ লক্ষাধিক বনি ইসরাইলের সাথে নিয়ে সদলবলে লোহিত সাগর পার হয়ে এ দিনে জালিম ফেরাউন থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছিলেন। হজরত আইয়ুব আঃ কঠিন ব্যাধি থেকে আরোগ্য লাভ করেছিলেন এই দিনে। পবিত্র মহররমের এই দশম দিনে হজরত ঈসা আঃ এই ভূপৃষ্ঠে এসেছিলেন এবং তাকে এ আশুরার দিনেই আসমানে অধিরোহণ করে নেয়া হয়।
পবিত্র আশুরার দিনটি উল্লিখিত ঐতিহাসিক ঘটনাবলি ছাড়াও আরো নানা কল্যাণকর ও বিস্ময়কর ঘটনার প্রেক্ষাপটেই চিরভাস্বর ও চিরস্মরণীয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মানবেতিহাসের ঊষালগ্ন থেকেই নানা জাতি নানা কারণে এ দিনে রোজা রাখত। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরত করে মক্কা থেকে মদিনা মুনাওয়ারায় গিয়ে দেখতে পেলেন ইহুদিরা এ দিনে রোজা পালন করতে। রোজা রাখার কারণ জানতে চাইলে তারা উত্তর দিলো, এই দিনে আল্লাহতায়ালা জালিম ফেরাউনকে লোহিত সাগরে ডুবিয়ে হজরত মূসা আঃ-কে নাজাত দিয়েছিলেন এবং দান করেছিলেন চিরবিজয়। তাঁর কৃতজ্ঞার্থে এ দিনটিতে আমরা রোজা পালন করে থাকি। এ কথা শুনে প্রিয় নবী বলেছিলেন, হজরত মূসা আঃ-এর সাথে আমাদের ঘনিষ্ঠতা আরো গভীর। তাই রাসূলুল্লাহ সাঃ হজরত সাহাবায়ে কিরামকে এ দিনটিতে রোজা রাখার নির্দেশ দেন এবং ইহুদিদের বিরোধিতা করে এ দিনটির আগে বা পরে আরো একটি করে রোজা রাখতে উৎসাহিত করেন, যাতে আমাদের সভ্যতা- সংস্কৃতি ইহুদি জাতির সভ্যতা-সংস্কৃতির সাদৃশ্য না হয়ে যায়। (বুখারিঃ ১/২৬৮, মুসলিমঃ ১/৩৭৮)
বাংলা নববর্ষ পালনের নামে ঢাকাসহ সারাদেশে উচ্ছৃঙ্খল একশ্রেণীর তরুণ-তরুণী যে দৃশ্যের অবতারণা করে থাকে, তা দেখে তো মনে হয় না, এটা মুসলিম দেশ এবং তারা মুসলিম পরিবারের সন্তান। ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে কারবালার প্রান্তরে এ আশুরার দিনে রাসূল দৌহিত্র হজরত ইমাম হুসাইন রাঃ যেমনিভাবে হায়দারি হুঙ্কার ছেড়ে অন্যায় আর অসত্যের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তেমনিভাবে আজ আমাদেরকে অপসংস্কৃতি ও অপশক্তির মূলোৎপাটনের লক্ষ্যে সদা তৎপর থাকতে হবে। হজরত হুসাইন রাঃ সপরিবারে অকাতরে শাহাদত বরণ করে এ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেলেন যে, ‘শির দেগা আমামা নেহি দেগা’। এ হোক আজ আমাদের বজ্রশপথ। হোক দৃঢ়প্রত্যয়।

মাওলানা ওসমান গনী হাজীপুরী

কারবালার শহীদানের কথা


কারবালার শহীদানের কথা


মহররম হিজরি সনের প্রথম মাস। এই মাসটি অত্যন্ত পবিত্র মাস হিসেবে বিবেচিত। মহররম শব্দের অর্থ নিষিদ্ধ। এই মাসে যুদ্ধবিগ্রহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আর এ মাসের ১০ তারিখ আশুরা নামে খ্যাত। এই ১০ তারিখে সংঘটিত হয়েছে বহু ঐতিহাসিক ঘটনা। এই দিন আল্লাহতায়ালা লাওহে মাহফুজ, দুনিয়া ও দুনিয়ার সব কিছু সৃষ্টি করেন, আসমান থেকে প্রথম বৃষ্টি বর্ষণ করেন। হজরত আদম আঃ-কে সৃষ্টি, তাঁর বেহেশতে প্রবেশ এবং তাঁর তওবা কবুল করেন। হজরত নূহ আঃ-কে অভিশপ্ত ৪০ দিনের মহাপ্লাবন থেকে উদ্ধার, হজরত ইবরাহিম আঃ-কে নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে মুক্তি, তুর পাহাড়ে আল্লাহতায়ালার সাথে হজরত মূসা আঃ-এর কথোপকথন, নীলনদে ফেরাউনকে ডুবিয়ে তাঁকে উদ্ধার, হজরত আইউব আঃ-এর ১৮ বছর রোগভোগের পর রোগমুক্তি, হজরত ইউনূস আঃ-কে মাছের পেট থেকে মুক্তি, হজরত ইয়াকুব আঃ ও তাঁর হারানো পুত্র হজরত ইউসুফ আঃ-এর পুনর্মিলন, হজরত সুলায়মান আঃ-এর রাজত্ব পুনরুদ্ধার, হজরত ঈসা আঃ-এর জন্ম ও আসমানে উঠানো এবং এই দিনই কোনো এক শুক্রবারে কিয়ামত সংঘটিত হবে।
এত সব ঘটনার জন্য আশুরা পবিত্র দিন হিসেবে বিবেচিত হওয়ার পরও আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনার জন্য মুসলিম জগতে চির স্মরণীয় হয়ে আছে। কারবালার প্রান্তরে হজরত ইমাম হোসেন রাঃ ইসলামবিরোধী স্বৈরাচারী ইয়াজিদের সহস্রাধিক আগ্রাসী সেনাবাহিনীর সাথে মরণপণ জিহাদে অবতীর্ণ হয়ে ১৩০ জন সঙ্গীসহ শাহাদত বরণ করেন।

এই প্রান্তরে দৃশ্যত ন্যায়ের পরাজয় হলেও পরে ন্যায়েরই বিজয় সংঘটিত হয়। তাই কবি জাওহার লিখেছেন, ‘ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হার কারবালা কি বাদ’। আমরা অনেকেই এই মর্মান্তিক ঘটনার শহীদানের নাম জানি না, যাঁরা সত্য ও ন্যায়ের জন্য আল্লাহর রাস্তায় নিশ্চিত পরাজয় জেনেও জীবন উৎসর্গ করেছেন। আজ সেসব বীর শহীদানের নাম পরম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি- ১. হজরত ইমাম হোসেন বিন আলী রাঃ ২. হজরত আলী আকবর বিন হোসেন রাঃ ৩. হজরত আলী আসগর বিন হোসেন রাঃ (ছয় মাসের শিশুপুত্র বাবার কোলে শহীদ হন)। তাঁরা দু’জন ইমাম হোসেনের পুত্র ৪. হজরত আব্বাস বিন আলী রাঃ ৫. হজরত আবদুল্লাহ বিন আলী রাঃ ৬. হজরত জাফর বিন আলী রাঃ ৭. হজরত ওসমান বিন আলী রাঃ, তাঁরা চারজন ইমাম হোসেনের সৎভাই। তাঁদের মায়ের নাম হজরত উম্মুল বেনিন ৮. হজরত আবদুল্লাহ বিন আলী রাঃ ৯. হজরত আবু বকর বিন আলী রাঃ­ তাঁরা দু’জনও ইমাম হোসেনের সৎভাই। তাঁদের মায়ের নাম হজরত লায়লা বিনতে মাসউদ ১০. হজরত কাসেম বিন ইমাম হাসান রাঃ ১১. হজরত আবদুল্লাহ বিন ইমাম হাসান রাঃ ১২. হজরত আবু বকর বিন ইমাম হাসান রাঃ ১৩. হজরত মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ বিন জাফর রাঃ­ হজরত জাফরের নাতি। তাঁর মায়ের নাম খাবছা, ১৪. হজরত আউন বিন আবদুল্লাহ বিন জাফর। তিনিও হজরত জাফর তাইয়ার ইবনে আবি তালিবের নাতি। তবে তাঁর মা ছিলেন ইমাম হোসেনের বোন ও কারবালার বীর নারীদের সর্দার হজরত জয়নাব বিনতে আলী রাঃ ১৫. হজরত আবদুল্লাহ বিন আকিল, ১৬. হজরত জাফর বিন আকিল, ১৭. হজরত আবদুর রহমান বিন আকিল। তাঁরা তিনজন ইমাম হোসেনের চাচা হজরত আকিলের পুত্র। উল্লেখ্য, হজরত আকিলের অপর পুত্র হজরত মুসলিম ও তাঁর দুই শিশুসন্তান কিছু দিন আগেই কুফায় শহীদ হয়েছিলেন। ১৮. হজরত মুহাম্মদ বিন আবু সাঈদ বিন আকিল। তিনিও হজরত ইমাম হোসেনের চাচা আকিলের নাতি। এই ১৮ জন শহীদ ছিলেন সরাসরি নবী পরিবারের ও বনি হাশিমের সদস্য।
বনি হাশিম ছাড়াও আরো ১১২ জন কারবালায় ইমাম হোসেনের পাশে থেকে শহীদ হয়েছিলেন।

তাঁরা হলেন­

১। হজরত ইব্রাহিম বিন হাসিন আসাদি

২। হজরত আবুল হানিফ বিন হারেস আনসারি

৩। হজরত আবু সামামা সায়েদি ৪। হজরত আবু আমের নাহশালি

৫। হজরত আহমদ বিন মুহাম্মদ হাশেমি,

৬। হজরত আদহাম বিন উমিদ আবদি,

৭। হজরত আসলাম তুর্কি,

৮। হজরত উমাইত বিন সাদ তাঈ,

৯। হজরত আনাস বিন হারেস কাহেলি,

১০। হজরত আনিস বিন মাক্কাল আসবাহি,

১১। হজরত বুরাইর বিন খাদির হামাদানি,

১২। হজরত বশর বিন আমরু হাজরামি,

১৩। হজরত বক্কর বিন হাই তাইমি,

১৪। হজরত জাবের বিন হারেস,

১৫। হজরত জিলাত বিন আলি সাইবানি,

১৬। হজরত জোন, ১৭। হজরত জুইন বিন মালেক তামিমি,

১৮। হজরত জুনাদা বিন হারেস আনসারি,

১৯। হজরত জুনাদা বিন কাব আনসারি,

২০। হজরত জুনদাব বিন হাজার কিন্দি,

২১। হজরত হারেস বিন ইমরাউল কায়েস কিন্দি,

২২। হজরত হারেস বিন নেইহান,

২৩। হজরত হাব্বাব বিন হারেস,

২৪। হজরত হাব্বাব বিন উমর শা’বি,

২৫। হজরত হাবশি বিন কাসেম নাহমি,

২৬। হজরত হাবিব বিন মাজাহের আসাদি,

২৭। হজরত হাজ্জাজ বিন বদর সাদি,

২৮। হজরত হাজ্জাজ বিন মাসরুক,

২৯। হজরত হরস বিন নেইহান,

৩০। হজরত হুর বিন ইয়াজিদ রিয়াহি (তিনি শত্রু পক্ষে ছিলেন পরে ইমাম হোসেনের পক্ষে যোগ দেন),

৩১। হজরত হালাস বিন আমরু রাসেবি,

৩২। হজরত হানজালা বিন সাদ শাবামি,

৩৩। হজরত খালেদ বিন আমরু বিন খালেদ,

৩৪। হজরত জাহের বিন আমরু,

৩৫। হজরত জুহাইর বিন বাশার খাসআমি,

৩৬। হজরত জুহাইর বিন সারিম আযুদি,

৩৭। হজরত জুহাইর বিন কেইন বাজালি,

৩৮। হজরত যিয়াদ বিন উবাইর সায়েদি,

৩৯। হজরত সালেম, ৪০। হজরত সালেম বিন আমরু,

৪১। হজরত সাদ বিন হরস,

৪২। হজরত সাদ,

৪৩। হজরত সাদ,

৪৪। হজরত সাঈদ বিন আবদুল্লাহ হানাফি,

৪৫। হজরত সাঈদ বিন হানজালা তামিমি,

৪৬। হজরত সালমান বিন মুজারেব বাজালি,

৪৭। হজরত সালমান, ৪

৮। হজরত সাওয়ার বিন মুনেম নাহামি,

৪৯। হজরত সুয়ায়িদ বিন আমরু (সর্বশেষ শহীদ),

৫০। হজরত সাইফ বিন হাসের বিন সারি,

৫১। হজরত সাইফ বিন মালেক আবদি,

৫২। হজরত শুজাব বিন আবদুল্লাহ হামাদানি,

৫৩। হজরত জার আমা বিন মালেক, ৫

৪। হজরত আয়াজ বিন মাজমা আযাদি,

৫। হজরত আবেস বিন শাবিব মাকেরি,

৫৬। হজরত আমের বিন হাইয়ান বিন শারিহ,

৫৭। হজরত আমের বিন মুসলেম বিন আবদি,

৫৮। হজরত ইবাদ বিন মুহাজের জাহনি,

৫৯। হজরত আবদুল আ’লা বিন ইয়াজিদ কালবি,

৬০। হজরত আবদুর রহমান বিন ওরবা গাফফারি,

৬১। হজরত আবদুর রহমান বিন আবদুল্লাহ বিন বাজনি,

৬২। হজরত আবদুর রহমান বিন মাসউদ তিমি,

৬৩। হজরত আবদুল্লাহ বিন আরজি,

৬৪। হজরত আবদুল্লাহ বিন আবুবক্কর ইবনে কাহানা,

৬৫। হজরত আবদুল্লাহ বিন বাশার খাসআমি,

৬৬। হজরত আবদুল্লাহ বিন ওরবা গাফফারি,

৬৭। হজরত আবদুল্লাহ বিন ওমাইর কালবি,

৬৮। হজরত আবদুল্লাহ বিন ইয়াজিদ আবদি,

৬৯। হজরত ওবায়দুল্লাহ বিন ইয়াজিদ আবদি,

৭০। হজরত ওকবা বিন সামআন,

৭১। হজরত ওকবা বিন সালাত জাহনি,

৭২। হজরত আইয়ার বিন সালখার আযুদি,

৭৩। হজরত আম্মার বিন হোসান তাঈ,

৭৪। হজরত আম্মার বিন সালামা,

৭৫। হজরত ইমরান বিন কাব,

৭৬। হজরত আমরু বিন আবদুল্লাহ জান্দায়ি,

৭৭। হজরত আমরু বিন খালেদ আযুদি,

৭৮। হজরত আমরু বিন খালেদ সাইদায়ি,

৭৯। হজরত আমরু বিন কারজা আনসারি,

৮০। হজরত আমরু বিন মাশিয়া (দাবিয়া),

৮১। হজরত আমরু বিন খুবাদা আনসারি,

৮২। হজরত আমরু বিন মুতা জাফি,

৮৩। হজরত ওমাইর বিন আবদুল্লাহ মাজহাজি,

৮৪। হজরত কারের বিন আবদুল্লাহ দায়ালি,

৮৫। হজরত কাসেত বিন জুহাইর তাগলাবি,

৮৬। হজরত কাসেম বিন হাবিব আযুদি,

৮৭। হজরত কুরাত বিন আবি কুরাত আনসারি,

৮৮। হজরত কায়নাব বিন আমরু,

৮৯। হজরত আমরু কারদুসি,

৯০। হজরত কানানা বিন আকিক আনসারি,

৯১। হজরত মালেক বিন আনাস কাহেলি,

৯২। হজরত মালেক বিন জুদান,

৯৩। হজরত মালেক বিন আবদুল্লাহ বিন সারি,

৯৪। হজরত মাজমা জাহনি,

৯৫। হজরত মাজমা বিন আবদুল্লাহ আয়েজি,

৯৬। হজরত মুহাম্মদ বিন বাশার হাজরাসি,

৯৭। হজরত মাসউদ বিন হাজ্জাজ তিমি,

৯৮। হজরত মুসলিম বিন কাসিব আযুদি,

৯৯। হজরত মুসলিম বিন আওসাজাহ,

১০০। হজরত মাসকাত বিন জুহাইর তাগলাবি,

১০১। হজরত মানজাহ বিন সাহায,

১০২। হজরত মাওকা বিন সামামা আসাদি,

১০৩। হজরত নাফে বিন হেলাল রাজালি,

১০৪। হজরত নাসর বিন আবি নেযজার,

১০৫। হজরত নুমান বিন আমরু রাসেবি,

১০৬। হজরত নাঈম বিন আজলান আনসারি,

১০৭। হজরত ওয়াজেহ রুমি,

১০৮। হজরত ওহাব বিন আবদুল্লাহ কালবি,

১০৯। হজরত ইয়াহিয়া বিন সালিম মাজানি,

১১০। হজরত ইয়াজিদ বিন সাবির আবদি,

১১১। হজরত ইয়াজিদ বিন যিয়াদ আবুল শাশা,

১১২। হজরত ইয়াজিদ বিন মাকাল।

এসব মহান শহীদদের নিয়ে হজরত ইমাম হোসেন রাঃ ও তাঁর পরিবারবর্গের শহীদানের মোট সংখা ১৩০ জন। (তথ্য সূত্র সিরাতে ইমাম হোসেন রাঃ - মুহসেন গাফফারি ইরানি।)


মসউদ-উশ-শহীদ

আশুরাঃ ইতিহাস ও ফজিলত


আশুরাঃ ইতিহাস ও ফজিলত


মহররম মাস আরবি তথা হিজরি বর্ষের প্রথম মাস। এ মাসটিকে মহররম বা নিষিদ্ধ মাস বলা হয়ে থাকে যেহেতু এ মাসে যুদ্ধবিগ্রহ বিশেষভাবে নিষিদ্ধ। প্রাক ইসলামি যুগে মহররম মাসের নাম ছিল আল মুতাসির। [মোজহের-পৃ.৬৯]
জাহেলি যুগে আরবরা কখনো কখনো এ মাসকে হারাম মনে করত, আবার কখনো কখনো এতে যুদ্ধবিগ্রহকে হালাল বা বৈধ মনে করত। ইসলামের আগমনের পর এ মাসকে সুনির্দিষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করা হয় এবং এ মাসের পবিত্রতা বর্ণনা করা হয়। তাই এ মাসকে আল মহররম বা হারাম মাস হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে। [আল মোজহের-৯২]
রাসূল সাঃ হাদিসে এ মাসের নামকরণ ও গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন­ ‘রামাদান মাসের সিয়ামের পর সর্বোৎকৃষ্ট সিয়াম (রোজা) হচ্ছে ‘আল্লাহতায়ালার মাস আল মহররমের রোজা।’ [সহিহ মুসলিম-১১৬৩] এ হাদিসের আলোকে মহররম মাসের গুরুত্ব ও নামকরণ এ দু’টি প্রমাণিত হলো।
মহররম মাসের মর্যাদা ও ফজিলতঃ সহিহ হাদিসের মাধ্যমে এ মাসের অনেক মর্যাদা ও ফজিলত সাব্যস্ত রয়েছে। এ মাসের মর্যাদা প্রমাণিত হওয়ার জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, এ মাসটি চারটি হারাম বা নিষিদ্ধ মাসের একটি মাস। রাসূল সাঃ পবিত্র কুরআনের আয়াতঃ তন্মধ্য থেকে চারটি হারাম মাস (সূরা আততাওবাহঃ ৩৬)
আয়েশা রাঃ হতে বর্ণিত; তিনি বলেন, রামাদান মাসের রোজা ফরজ করার আগে মুসলমানরা আশুরার দিন রোজা রাখত। আর এ দিন কাবাঘরের গিলাফ পরানো হতো। যখন রামাদানের রোজা ফরজ করা হলো তখন রাসূল রাঃ এ ঘোষণা দিলেন তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি ইচ্ছা করে এ দিনের রোজা রাখার সে রোজা রাখবে। আর যে রোজা পরিহার করতে চায় সে তা পরিহার করবে। [বুখারি ১৫১৫, ১৭৯৪]
এ হাদিস থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, রামাদানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে মুসলমানরা এ দিন রোজ রাখতেন। এমনকি রাসূল সাঃও তাদের এ দিনের রোজা পালন করতে নির্দেশ দিয়েছেন। অপর এক বর্ণনায় এসেছে জাহেলি সমাজের কুরাইশ মুশরিকরাও এ দিনে রোজাব্রত পালন করত। [বুখারি-১৭৯৪]
এ দিনের মর্যাদা উপলব্ধি করে ইহুদি সমাজও এ দিনকে ঈদ হিসেবে গ্রহণ করত এবং বিশেষভাবে এ দিনের রোজাব্রত পালন করত। রাসূল সাঃ হতে প্রসিদ্ধ সাহাবি ইবনে আব্বাস রাঃ বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, নবী সাঃ যখন মদিনায় আগমন করেন তখন তিনি ইহুদিদের দেখতে পেলেন তারা আশুরার দিবসে সিয়াম পালন করছে, তাদের জিজ্ঞেস করা হলো; এ দিনের রোজা সম্পর্কে তারা বলল­ এ দিন আল্লাহতায়ালা মূসা আঃ ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউন ও তার সম্প্রদায়ের ওপর বিজয় দান করেছেন, তাই আমরা এ দিনের সম্মান ও মহত্ত্বের জন্য রোজা পালন করি। তাদের প্রতি উত্তরে রাসূল সাঃ এরশাদ করলেন­ আমরা তোমাদের চেয়ে মূসার উত্তম অনুসারী, অতঃপর তিনি এ দিনের রোজা রাখতে সাহাবিদের নির্দেশ দেন।’ [বুখারি ৩৭২৭]
আশুরার দিনে রোজা রাখার বিশেষ ফজিলত হচ্ছে, রাসূল সাঃকে এ দিনের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এ দিনের রোজা পালন গত এক বছরের গুনাহগুলোর কাফফারাস্বরূপ। [সহিহ মুসলিম-১১৬২]
ইবনে আব্বাস রাঃ বর্ণিত অপর এক হাদিসে এসেছে, আশুরার দিবসের রোজা প্রসঙ্গে তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, আমার জানা নেই রাসূল সাঃ এ দিন ছাড়া অন্য কোনো দিন ফজিলতের উদ্দেশ্যে রোজা পালন করতেন। আর এ মাস অর্থাৎ রামাদান ছাড়া অন্য কোনো মাসে তিনি রোজা পালন করতেন। সুতরাং এ কথা প্রমাণিত হলো যে, রাসূল সাঃ এ দিনের রোজা রাখাকে ফজিলত ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করতেন।
সহিহ মুসলমানের অপর বর্ণনায় এসেছে, রাসূল সাঃ এরশাদ করেছেন, আশুরার দিবসের রোজা পালনে আমি গত বছরের গুনাহের কাফফারা হিসেবে আশা পোষণ করি। [সহিহ মুসলিম-২৮০৩]
রামাদানের ফরজ রোজার পর সাধারণ নফল সিয়ামের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট সিয়াম হচ্ছে এ মাসে নফল রোজা পালন করা। সুতরাং আশুরার দিবসের সিয়াম পালন করা ছাড়াও এ মাসে বেশি বেশি নফল রোজা পালন করা ফজিলতময় কাজের অন্তর্ভুর্êক্ত।
হাফেজ ইবনে রজব রহঃ আশুরার দিবসের রোজা সব নবীর কাছে পরিচিত বিষয় ছিল নূহ ও মূূসা আঃ এ দিনের রোজা রেখেছেন। আহলে কিতাবরা এ দিনের রোজা রেখেছে, মক্কার কুরাইশ মুশরিকরা এ দিনের রোজা রাখত, এ দিনের রোজা পালনের ক্ষেত্রে রাসূল সাঃ-এর চারটি অবস্থা ছিল।
প্রথমত, মক্কায় থাকা অবস্থায় রাসূল সাঃ এ দিন রোজা রাখতেন কিন্তু এ দিনের রোজা পালনের জন্য কোনো প্রকার নির্দেশ দেননি। বুখারি ও মুসলিমে আয়েশা রাঃ হতে বর্ণিত হাদিস এ কথায় সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করছে।
দ্বিতীয়ত, রাসূল সাঃ মদিনা আগমনের পর যখন ইহুদিদের দেখলেন তারা ওই দিনের গুরুত্ব ও মর্যাদা উপলব্ধি করে রোজা রাখছে। তিনি এ দিনের রোজা রাখেন এবং সাহাবিদের এ দিনের রোজা পালন করতে নির্দেশ দিলেন। রোজা রাখার ব্যাপারে এত বেশি গুরুত্ব দিলেন যে, সাহাবিরা তাদের শিশু-সন্তানদেরও এ দিন রোজা রাখতে বাধ্য করত।
মুসলমান ইমাম আহমাদে আবু হুরাইরা রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন­ নবী সাঃ এক দিন কিছুসংখ্যক ইহুদির পাশ দিয়ে অতিক্রম করে যাচ্ছেন, এমতাবস্থায় তারা আশুরার রোজা রেখেছে, তিনি জিজ্ঞেস করলেন? এটা কী ধরনের রোজা? উত্তরে তারা বলল­ এ দিন মহীয়ান গরিয়ান আল্লাহতায়ালা মূসা আঃ ও বনি ইসরাইলকে পরিত্রাণ দিয়েছেন, ফেরাউনকে তার সম্প্রদায়সহ ডুবিয়ে মেরেছেন। এ দিন নূহ আঃ-এর নৌকা আল জুদি পাহাড়ের নাগাল লাভ করেছে, তাই নূহ ও মূসা আঃ মহীয়ান আল্লাহর কৃতজ্ঞতাবশত এ দিনের সিয়াম পালন করেছেন। আমরাও এ দিনের সিয়াম পালন করছি। রাসূল সাঃ তাদের উত্তরে বললেন­ মূসার ব্যাপারে আমি তাদের চেয়ে অধিক হকদার, এ দিনের রোজা পালন আমার জন্য তাদের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, অতঃপর তিনি তাঁর সাহাবিদের এ দিনের রোজা রাখতে নির্দেশ দেন। [মুসনাদ আহমাদ-৮৭০২, হাফেজ ইবনে হাজার ফাতহুল বারতে হাসান হিসেবে উল্লেখ করলেও শাইখ আলবানি ও শোয়াইব আরনাউত সনদটি দুর্বল বলেছেন]
সহিহ বুখারি ও মুসলিমে সালামাহ ইবন আকওয়া রাঃ হতে বর্ণিত, নবী সাঃ বনি আসলাম গোত্রের এক লোককে নির্দেশ দিলেন সে যেন লোকদের মাঝে এ ঘোষণা করে দেয়, যে আজ সকালে খেয়েছে সে যেন দিবসের বাকি অংশ রোজা পালন করে, আর যে ব্যক্তি কিছু খায়নি সে যেন রোজা রাখে কেননা আজকের এ দিন আশুরার দিন।
অপর বর্ণনায় রুবাঈ বিনতে মু’আওয়ামের সূত্রে এসেছে, রাসূল সাঃ আশুরার দিন সকালে মদিনার আশপাশে আনসারদের গ্রামগুলোতে লোক প্রেরণ করে এ ঘোষণা দিলেন, যে ব্যক্তি আজ রোজা রেখেছে সে রোজা সম্পন্ন করবে, আর যে ব্যক্তি রোজা রাখেনি সে দিবসের বাকি সময় রোজা পালন করবে। অতঃপর আমরা এ দিন রোজা রাখতাম এবং আমাদের ছোট সন্তানদেরও রোজা রাখতে বাধ্য করতাম। এ দিন রাসূল সাঃ-এর নির্দেশের গুরুত্ব এতে এটাও প্রমাণিত হয় যে, এ দিনের রোজা রাখার নির্দেশ রাসূল সাঃ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রদান করতেন।
তৃতীয় অবস্থাঃ রামাদান মাসের রোজা ফরজ হওয়ার পর রাসূল সাঃ আশুরার রোজা রাখার নির্দেশ তুলে নেন। এবং এ ক্ষেত্রে শিথিলতা প্রদর্শন করেন। বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত আছে, ইবনে উমার রাঃ থেকে বর্ণিত, নবী সাঃ আশুরার রোজা রেখেছেন এবং রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন, তবে যখন রামাদানের রোজা ফরজ করা হলো তিনি এ নির্দেশ পরিহার করেন। তাই আবদুল্লাহ ইবন উমার তার নির্ধারিত নফল রোজার দিন না হলে আশুরার এ দিনের রোজা রাখতেন না।
এসব হাদিস থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, নবী সাঃ রামাদানের রোজা ফরজ হওয়ার পর আশুরার সিয়াম পালনকে নির্দেশ শিথিল করে নেন। এরপর এ দিনের রোজা বাধ্যতামূলক ছিল না। এ দিনের রোজা পালন মুস্তাহাব বা সুন্নাতের পর্যায়ের রয়ে যায়। তার পরও উমার আন্নিআবদুর রহমান ইবন আউফ আবু মূসা, কায়স ইবনে সাদ, ইবনে আব্বাস প্রমুখ থেকে এ দিনের রোজা রাখা প্রমাণিত হয়।
চতুর্থ অবস্থাঃ নবী সাঃ তার জীবনের শেষ দিকে এ দিনের সাথে অন্য এক দিনসহ রোজা রাখার সঙ্কল্প করেন। যেহেতু ইহুদি সম্প্রদায় শুধু এ দিনের রোজা পালন করে থাকে তাই তিনি তাদের বিরোধিতা করণার্থে এ দিনের সাথে আরো এক দিন রোজা রাখার ইচ্ছা পোষণ করেন। সহিহ মুসলিমে ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন রাসূল সাঃ আশুরার দিবসে রোজা রাখলেন এবং এ দিনের রোজা রাখতে নির্দেশ দিলেন, সাহাবিরা তাকে জানালেনঃ হে আল্লাহর রাসূল সাঃ, এ দিনটিকে ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা মর্যাদা দিয়ে থাকে। তখন রাসূল সাঃ বললেন, তাহলে ইনশাল্লাহ আগামী বছর এলে আমরা নবম তারিখেও রোজা রাখব। বর্ণনাকারী বলেন, আগামী বছর আসার আগেই রাসূল সাঃ-এর ইন্তেকাল হয়ে যায়। অপর এক বর্ণনায় এসেছে, ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে তিনি বলেন, রাসূল রাঃ এরশাদ করেছেন, যদি আমি আগামী বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকি অবশ্যই আশুরার সাথে নবম দিনও রোজা রাখব। মুসানাদ ইমাম আহমাদে এসেছে, ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত আছে, নবী সাঃ এরশাদ করেছেন, আশুরার দিবসে তোমরা রোজা রাখো, আর এ ক্ষেত্রে ইহুদিদের বিরোধিতাকারী আশুরার আগে এক দিন এবং পরে এক দিন রোজা রাখো। এ হাদিসগুলো থেকে এ কথা প্রমাণিত হয় যে, আশুরার রোজার ক্ষেত্রে রাসূল সাঃ-এর সর্বশেষ অবস্থা ছিল তিনি এ দিনের সাথে অন্য এক দিন অর্থাৎ ৯ তারিখে রোজা রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
আশুরার সিয়াম পালনের পদ্ধতিঃ কেবল ১০ তারিখ রোজা পালন করাকে কেউ কেউ মাকরুহ বলেছেন। ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে এরূপ বর্ণনা রয়েছে। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাহিমজা রহঃ বলেন, বিশুদ্ধ বক্তব্য হচ্ছে ৯ ও ১০ তারিখের দুই দিন রোজা রাখা। কেননা এ ছিল রাসূল সাঃ-এর জীবনের শেষ দিনের সঙ্কল্প। অপর দিকে এতে রয়েছে আহলে কিতাব তথা ইহুদিদের বিরোধিতা ও তাদের সাদৃশ্য; তা থেকে মুক্তি লাভ। তবে যেহেতু রাসূল সাঃ এ দিন এককভাবে রোজা রেখেছেন, সেহেতু কেবল এ দিনের রোজা রাখা যেতে পারে। [ইকতেজাউস্‌ সিরাত]
ইবনুল কাইয়্যেম রহঃ জাদুল মা’আদ-এ উল্লেখ করেন, ‘আশুরার দিবসের রোজার তিনটি গ্রেড রয়েছে। সর্বোচ্চ গ্রেড হচ্ছে এর আগে ও পরে মোট তিনটি রোজা রাখা; তারপর হচ্ছে ৯ ও ১০-এ দুই দিনের রোজা রাখা। অধিকাংশ হাদিস এভাবে এসেছে। এরপর হচ্ছে কেবল ১০ তারিখের রোজা রাখা। এ বক্তব্য থেকে এটাও প্রতীয়মান হয় যে, কেবল ১০ তারিখের রোজা রাখা মাকরুহ নয়। আশুরার সাথে কারবালার ঘটনার সম্পর্ক।
উপরিউক্ত হাদিসগুলো থেকে এ কথাও আমাদের সামনে প্রমাণিত হলো যে কারবালার ঘটনার বহু আগ থেকেই আশুরার মর্যাদা ও ফজিলত সাব্যস্ত হয়েছে। আশুরার এ ফজিলত ও মর্যাদাকে কারবালার ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত করা সত্যিই বিভ্রান্তিকর ও অসঠিক। কারবালার ঘটনার প্রায় ৫১ বছর আগে আশুরার রোজা ও ফজিলত হাদিস দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে। তাই আশুরার শিক্ষার নামে কারবালার ঘটনা টেনে এনে কিছুসংখ্যক বুদ্ধিজীবী যে ঐতিহাসিক বিভ্রাট তৈরি করেন এবং একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের আদর্শিক ও নৈতিক ধ্যান-ধারণার বহিঃপ্রকাশ করে থাকেন তা সত্যিই আদর্শিক বেড়াজাল। তার এ কথা সত্য, অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে রাসূল সাঃ-এর দৌহিত্র হুসাইন ইবনে আলী রাঃ ৬১ হিজরি সনের আশুরার দিন শাহাদত বরণ করেন। তার এই শাহাদত ছিল ইসলামের ইতিহাসে এক অকার অধ্যায় এবং এ ঘটনা ছিল মহীয়ান আল্লাহ তায়ালার অবধারিত ফয়সালা। এ দিনের মর্যাদা ও ফজিলতের সাথে তার এ শাহাদতের কোনো সম্পর্ক নেই কেবল এতটুকু ছাড়া যে, দিনটি ছিল আশুরার দিন।


ড. মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ আল মাদানী

কোরআন ও হাদীসে নারীর অধিকার

কোরআন ও হাদীসে নারীর অধিকার ০ ‘পুরুষদের যেমন স্ত্রীদের উপর অধিকার রয়েছে। তেমনি নিয়ম অনুযায়ী স্ত্রীদের ও অধিকার রয়েছে পুরুষদের উপর। আর...